● বিসিএস লিখিত: আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি

বিভিন্ন প্রকার কূটনীতি: Track I, Track II, Multi-Track, জন কূটনীতি ও আরও | বিসিএস লিখিত

📌 এক নজরে

কূটনীতি শুধু রাষ্ট্রদূত বা রাষ্ট্রপ্রধানদের কাজ নয়; দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও স্বার্থরক্ষায় নানা ধরনের কূটনীতি ব্যবহৃত হয়। এই বড় পোস্টে Dual Track থেকে Track I-III, Multi-Track, জন কূটনীতি, সাংস্কৃতিক, প্রতিরোধমূলক কূটনীতিসহ অনেক প্রকার এক জায়গায় পাবেন। প্রতিটি আলাদা শিরোনামে, তাই প্রয়োজনীয় অংশে সরাসরি যাওয়া যাবে।
📑 এই পোস্টে যা পাবেন

১Track III Diplomacy২Multi-Track Diplomacy৩পাণ্ডা বনাম ঘোড়া কূটনীতি৪সর্বগ্রাসী কূটনীতি (Totalitarian Diplomacy)৫Cultural Diplomacy (সাংস্কৃতিক কূটনীতি)৬Checkbook Diplomacy (চেকবুক ডিপ্লোমেসি)৭Dollar Diplomacy৮Gunboat Diplomacy (গানবোট কূটনীতি)৯❑ সালামি স্লাইসিং১০❑ ড্রোন কূটনীতি১১❑ আম কূটনীতি১২ফুটবল কূটনীতি১৩স্ট্রিং অফ পার্লস১৪ঋণ-ফাঁদ কূটনীতি১৫'মেগাফোন কূটনীতি' (megaphone diplomacy)১৬অলিম্পিক ডিপ্লোম্যাসি বা অলিম্পিক কূটনীতি

বিভিন্ন প্রকার কূটনীতি সম্পর্কে লিখ।

দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কোন্নয়ন, পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখা, স্বার্থরক্ষার বা প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টায় গোটা দুনিয়ার প্রায় সব দেশই জোর দেয় কূটনীতির ওপর। কূটনীতির জটিল মারপ্যাঁচ শুধুমাত্র রাষ্ট্রদূত বা রাষ্ট্রপ্রধানদের আলোচনা বা সফরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রের অপরিহার্য এই বিভাগে মানুষ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে বিভিন্ন প্রাণী, খাবার, খেলাধুলা, হুমকি, ঋণ-ফাঁদ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইত্যাদি। উদ্ভট মনে হলেও সত্যি যে, কূটনৈতিক কৌশলে ব্যবহৃত হয়ে আসছে নানা রকমের কৌশল। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কূটনীতি নিচে আলোচনা করা হলো:

Dual Track Diplomacy (দ্বৈত ট্র্যাক কূটনীতি)

দ্বৈত ট্র্যাক কূটনীতি বলতে এমন পরিস্থিতিকে বোঝায় যেখানে একটি দেশ একই সাথে দুই বা ততোধিক বিপরীত নীতি বা কৌশল অনুসরণ করে। ইরানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে প্রকৃতপক্ষে দ্বৈত-ট্র্যাক কূটনীতির উদাহরণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। ওবামা প্রশাসনের অধীনে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রতি চাপ এবং কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার দ্বৈত-ট্র্যাক পদ্ধতি ব্যবহার করেছিল। এক পথে, ইরানের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বজায় রেখেছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল ইরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার জন্য চাপ দেওয়া। অন্য পথে, ওবামা প্রশাসন পারমাণবিক সমস্যা সমাধানের জন্য ইরানের সাথে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়েছিল। এর ফলশ্রুতিতে, ২০১৫ সালে ইরানের সাথে P5+1 (জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য: চীন, ফ্রান্স, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-সহ জার্মানি) দেশের সাথে JCPOA চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

  • ScienceDiplomacy
  • BusinessDiplomacy
  • DigitalDiplomacy
  • CityDiplomacy
  • DefenceDiplomacy
  • EconomicDiplomacy
  • CitizenDiplomacy
  • JournalismDiplomacy
  • PublicDiplomacy
  • SportDiplomacy
  • CulturalDiplomacy
  • ClimateDiplomacy
  • CyberDiplomacy
  • DIPLOMACY360°

Track I Diplomacy

Track I কূটনীতি আনুষ্ঠানিক বা সরকারি কূটনীতি নামেও পরিচিত। এটি রাষ্ট্র বা আন্তর্জাতিক সংস্থার অফিশিয়াল প্রতিনিধিদের মধ্যে মিথস্ক্রিয়া। এই মিথস্ক্রিয়াগুলি সাধারণত আনুষ্ঠানিক এবং কাঠামোগত হয়, প্রায়শই রাষ্ট্রপ্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, কূটনৈতিক বা অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের মতো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জড়িত করে।

উদাহরণ: ট্র্যাক আই কূটনীতির একটি উদাহরণ হতে পারে ইসরায়েল এবং মিশরের মধ্যে শান্তি আলোচনা যার ফলশ্রুতিতে ১৯৭৮ সালের ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি হয়েছিল যা মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার মধ্যস্থতা করেছিলেন।

  • ট্র্যাক ১.৫ কূটনীতি: এই শব্দটি একটি হাইব্রিড পদ্ধতিকে বোঝায় যা ট্র্যাক I এবং ট্র্যাক II কূটনীতি উভয়ের উপাদানকে একত্র করে। এতে জটিল সমস্যা বা দ্বন্দ্ব মোকাবেলায় যৌথ প্রচেষ্টায় একসঙ্গে কাজ করা অফিশিয়াল প্রতিনিধি (ট্র্যাক I) এবং অ-অফিশিয়াল অভিনেতাদের (ট্র্যাক II) মিশ্রণ জড়িত। এটি অফিশিয়াল এবং অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলগুলির মধ্যে ব্যবধান পূরণ করতে চায়, আরও বৈচিত্র্যময় দৃষ্টিভঙ্গির অনুমতি দেয়, এবং অফিশিয়াল সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সম্ভাব্যভাবে প্রভাবিত করে।

Track II Diplomacy (Backchannel Diplomacy)

এটি সরকার-থেকে-সরকার আলোচনার আনুষ্ঠানিক চ্যানেলের বাইরে কাজ করে এবং এতে ব্যক্তি বা গোষ্ঠী জড়িত যারা তাদের নিজ নিজ সরকারের সরকারি প্রতিনিধি নয়। ট্র্যাক II কূটনীতির ব্যাখ্যা করার জন্য এখানে একটি উদাহরণ দেওয়া হলো: ধরুন দুটি প্রতিবেশী দেশ, দেশ A এবং দেশ B-এর মধ্যে একটি চলমান আঞ্চলিক বিরোধ রয়েছে। দুই সরকারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক আলোচনা একটি অচলাবস্থায় পৌঁছেছে এবং পক্ষের মধ্যে আস্থা ও বোঝাপড়ার অভাব রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, ট্র্যাক II কূটনীতি কার্যকর হতে পারে। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা, প্রাক্তন কূটনীতিকবিদ, শিক্ষাবিদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, একাডেমিক প্রতিষ্ঠান এবং উভয় দেশের বিশেষজ্ঞরা সংলাপের সুবিধার্থে এবং বিবদমান পক্ষের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করার জন্য একের পর এক অনানুষ্ঠানিক সভা, কর্মশালা এবং সংলাপের আয়োজন করতে পারে।

Track III Diplomacy

Track III Diplomacy মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগের সাথে সম্পর্কিত। ট্র্যাক III কূটনীতি কূটনীতির অনানুষ্ঠানিক এবং বেসরকারি স্তরকে বোঝায় যা রাষ্ট্রসমূহের মধ্যকার সংঘাতের সমাধান, শান্তি বিনির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়াসে কাজ করে। এটি সরকার থেকে সরকার আলোচনার (ট্র্যাক 1 কূটনীতি) এবং সরকারি সহায়তার সাথে আধা-সরকারি মিথস্ক্রিয়া (ট্র্যাক 2 কূটনীতি)-এর বাইরে কাজ করে। ট্র্যাক 3 কূটনীতির লক্ষ্য হলো সংলাপ সহজতর করা, আস্থা তৈরি করা, এবং অনানুষ্ঠানিক চ্যানেলগুলির মাধ্যমে দ্বন্দ্বের উদ্ভাবনী সমাধানগুলি অন্বেষণ করা।

Multi-Track Diplomacy

বিভিন্নমুখী কূটনৈতিক উদ্যোগকে (Track – I, II, III) যখন বিভিন্ন ট্র্যাকে একই সাথে চালিয়ে যাওয়া হয় তাকে মাল্টি-ট্র্যাক কূটনীতি বলা হয়। এটি মূলত ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিকে লুইস ডায়মন্ড এবং জন ম্যাকডোনাল্ড দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল এবং দ্বন্দ্ব সমাধান এবং শান্তি অধ্যয়নের ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়ে। “মাল্টিট্র্যাক” শব্দটি এই ধারণাটিকে বোঝায় যে অসংখ্য পথ বা “ট্র্যাক” রয়েছে যার মাধ্যমে কূটনীতি চালানো যেতে পারে। এই ট্র্যাকগুলি প্রায়শই একযোগে কাজ করে এবং একে-অপরের পরিপূরক হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ: ধরা যাক বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন। একই সাথে ড. রেহমান সোবহান ও অভিজিৎ ব্যানার্জি যদি একই বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে থাকেন সেটাই হবে মাল্টি-ট্র্যাক কূটনীতি। ম্যাকডোনাল্ডের ধারণা অনুসারে মাল্টিট্র্যাক কূটনীতির ৯টি ট্র্যাক এখানে রয়েছে:

ট্র্যাক- ১: সরকার;
ট্র্যাক- ২: শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী;
ট্র্যাক- ৩: ব্যবসায়ী;
ট্র্যাক- ৪: নাগরিক;
ট্র্যাক- ৫: গবেষক
ট্র্যাক- ৬: সমাজ-আন্দোলন কর্মী;
ট্র্যাক- ৭: ধর্মীয় গোষ্ঠী;
ট্র্যাক- ৮: প্রতিষ্ঠান প্রধান;
ট্র্যাক- ৯: গণমাধ্যম।
  • TRACK 1Government
  • TRACK 2ProfessionalConflict Resolution
  • TRACK 3Business
  • TRACK 4Private Citizen
  • TRACK 5Research, Training,and Education
  • TRACK 6Peace Activism
  • TRACK 7Religion
  • TRACK 8Funding
  • TRACK 9Media and Public Opinion(inner circle)

পাণ্ডা বনাম ঘোড়া কূটনীতি

চীনের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশে আছে পাণ্ডা কূটনীতি। তাং সাম্রাজ্যের সময় সম্রাজ্ঞী উ জেতিয়াং জাপানের সম্রাটকে পাণ্ডা উপহার দিয়ে এই কূটনীতির সূচনা করেছিলেন। বেশ কয়েকবারই চীন বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানকে পাণ্ডা উপহার দিয়েছে। ২০১৮ সালে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাথোঁ চীনের প্রেসিডেন্টকে দিয়েছিলেন ঘোড়া উপহার। অনেকেই বলছেন, চীনের পাণ্ডা কূটনীতির অনুসরণ করে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ঘোড়া কূটনীতির আশ্রয় নিয়েছেন। এর উদ্দেশ্য নিশ্চিতভাবেই চীনের প্রেসিডেন্টকে তুষ্ট করা। ঘোড়াটির নাম ভিসুভিয়াস দ্য ব্রেক্কা। আট বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত এই ঘোড়া ফ্রান্সের রিপাবলিকান গার্ডে নিয়োজিত ছিল। সর্বশেষ এই ঘোড়া প্রেসিডেন্টবাহী বহরে অংশ নিয়েছিল গত বছরের নভেম্বর মাসে। এই পছন্দের পেছনে অবশ্য আরেকটা কারণ রয়েছে। ২০১৪ সালে ফ্রান্স সফরে গিয়েছিলেন সি চিন পিং। সে সময় ১০৪টি সুসজ্জিত ঘোড়ায় চেপে ফরাসি সেনারা তাঁকে অভিবাদন জানিয়েছিল। চীনের প্রেসিডেন্ট এতে মুগ্ধ হয়েছিলেন।

সর্বগ্রাসী কূটনীতি (Totalitarian Diplomacy)

সর্বগ্রাসীতা হল সরকারের একটি রূপ যেখানে রাষ্ট্র তার ক্ষমতা বজায় রাখার জন্য প্রায়ই দমন ও প্রচার ব্যবহার করে, সরকারি ও ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি দিক নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। কূটনীতির প্রেক্ষাপটে, সর্বগ্রাসী শাসনব্যবস্থাগুলি তাদের বৈদেশিক সম্পর্কগুলি এমনভাবে পরিচালনা করে যা তাদের কর্তৃত্ববাদী প্রকৃতিকে প্রতিফলিত করে।

সর্বগ্রাসী কূটনীতির বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে:

  • কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ: কূটনৈতিক সিদ্ধান্তগুলি সাধারণত বৃহত্তর জনসংখ্যা বা অন্যান্য সরকারী সংস্থার কাছ থেকে খুব বেশি ইনপুট ছাড়াই নেতাদের একটি ছোট দল বা একক একনায়ক দ্বারা নেওয়া হয়।
  • প্রোপাগান্ডা এবং ম্যানিপুলেশন: তারা তথ্যের কারসাজি করতে পারে এবং বিদেশে শাসনের অনুকূল চিত্র উপস্থাপন করতে মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে।
  • আক্রমণাত্মক এবং সম্প্রসারণবাদী নীতি: সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রগুলি অন্যান্য দেশের উপর তাদের আধিপত্য এবং প্রভাব জাহির করার জন্য আক্রমণাত্মক এবং সম্প্রসারণবাদী বিদেশী নীতি অনুসরণ করে।
  • গোপনীয় এবং অপ্রত্যাশিত আচরণ: সর্বগ্রাসী শাসনব্যবস্থাগুলি তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কে গোপনীয় বা অপ্রত্যাশিত আচরণে জড়িত হতে পারে, যা অন্যান্য রাষ্ট্রের পক্ষে তাদের কর্ম বা উদ্দেশ্য অনুমান করা কঠিন করে তোলে।
  • আন্তর্জাতিক নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধার অভাব: সর্বগ্রাসী শাসনব্যবস্থাগুলি তাদের কূটনৈতিক লেনদেনে আন্তর্জাতিক নিয়ম, আইন এবং প্রতিষ্ঠানগুলিকে উপেক্ষা করে, তাদের নিজস্ব স্বার্থ এবং উদ্দেশ্যকে সর্বোপরি অগ্রাধিকার দেয়।

সর্বগ্রাসী কূটনীতির উদাহরণগুলি ঐতিহাসিক শাসনের বৈদেশিক নীতিতে দেখা যায়, যেমন অ্যাডলফ হিটলারের অধীনে নাৎসি জার্মানি, জোসেফ স্ট্যালিনের অধীনে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং কিম রাজবংশের অধীনে উত্তর কোরিয়া। এই শাসনব্যবস্থাগুলি তাদের সর্বগ্রাসী এজেন্ডাগুলিকে এগিয়ে নেওয়ার একটি হাতিয়ার হিসাবে কূটনীতি ব্যবহার করেছিল, যা প্রায়শই সংঘাত, দমন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকে ধাবিত করে।

  • ব্লক কূটনীতি বা নিষেধাজ্ঞা কূটনীতি (Block Diplomacy/Sanction Diplomacy)

কোন দেশের আচরণে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দেখতে চাওয়ার জন্য কূটনৈতিক অস্ত্র হিসেবে আজকাল বহুল ব্যবহৃত কূটনীতি হল নিষেধাজ্ঞার কূটনীতি। সাধারণত কোনো দেশ আরেকটিকে দেশকে বা নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে বা প্রতিষ্ঠানকে শাস্তি দেয়ার জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এমন দেশ এরকম নিষেধাজ্ঞা জারি করে, যেসব দেশে ওই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের যাতায়াত, বিনিয়োগ বা স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় রয়েছে। আবার নিষেধাজ্ঞা অনেক সময় এক দেশ আরেক দেশের ওপর প্রতিশোধ হিসেবে আরোপ করে। যেমনটা রাশিয়া ২০১৪ সালে ইইউ এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদে করেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে লঙ্ঘন করে এমন দেশগুলোর বিরুদ্ধে সাধারণত নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। তবে তার পরিধি বৃদ্ধি পেয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে। এতে যুক্ত হয়েছে মানবাধিকার, গণতন্ত্রসহ বিভিন্ন ইস্যু। ১৯৯০-এর দশক থেকে এ পর্যন্ত বিশ্বে যত দেশের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে তার তিন ভাগের দুই ভাগই আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯৮ সালের পর তারা কমপক্ষে ২০টি দেশের বিরুদ্ধে দিয়েছে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। ১৮০৭ সালে এমবারগো অ্যাক্ট ব্যর্থ হওয়ার পর বিদেশি দেশগুলোর বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপে যুক্তরাষ্ট্র খুব সামান্যই আগ্রহ দেখায়। তবে বিংশ শতাব্দীতে এসে তা আবার শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির পুরোটাই হলো অর্থনৈতিক নীতি বিষয়ক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তাদের আগ্রহ পুনরুজ্জীবিত হয়। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য লীগ অব নেশনসের মেথড হিসেবে এমন নিষেধাজ্ঞাকে অনুমোদন দেন প্রেসিডেন্ট উডরো উইলসন।

  • অর্থনৈতিক কূটনীতি (Economic Diplomacy):

“

‘Economic diplomacy is the process through which countries tackle the outside word, to maximize their national gain in all the fields of activity including trade, investment and other forms of economically beneficial exchanges, where they enjoy comparative advantage; it has bilateral, regional and multilateral dimensions, each of which is important’.

—কূটনীতিবিদ রানার

অর্থনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্র ও সরকারের মধ্যে প্রচলিত বিশেষজ্ঞগণ কর্তৃক পরিচালিত কলাকৌশলকে অর্থনৈতিক কূটনীতি বলে। অর্থনৈতিক কূটনীতি অর্থনৈতিক কার্যাবলি নিয়ে আলোচনা করে এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে চুক্তি সম্পাদন করে। একটি রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সুবিধা হাসিলে কূটনীতি পরিচালনা করবে বা অন্য কথায়, অন্য রাষ্ট্রের সম্পদের নাগাল পাওয়ার চেষ্টায় রত থাকবে। এরূপ লক্ষ্য অর্জনে অনুসৃত নীতিকেই বলা হয় অর্থনৈতিক কূটনীতি।

অর্থনৈতিক কূটনীতি হলো এমন কতিপয় কার্যাবলির সমষ্টি যেগুলো একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক নীতি কীভাবে অপর রাষ্ট্রের নীতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে সে ব্যাপারে আলোকপাত করে। অর্থনৈতিক কূটনীতির প্রধান উদ্দেশ্যই হলো কূটনৈতিক বোঝাপড়া ও দর কষাকষির মাধ্যমে নিজ রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করা। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক জোটসমূহ যেমন— বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO), আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (IMF), বিশ্বব্যাংক (WORLD BANK), আসিয়ান (ASEAN), ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU), জি-৮ (G-8), সাফটা (SAFTA), নাফটা (NAFTA) ইত্যাদি অর্থনৈতিক কূটনীতির প্রতিষ্ঠার ফসল।

অর্থনৈতিক কূটনীতির মূল উদ্দেশ্য হলো:

  • বৈদেশিক বিনিয়োগকে আকর্ষণ করা
  • রপ্তানি বৃদ্ধিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা
  • শ্রমশক্তি বিদেশে রপ্তানিকল্পে ব্যবস্থা গ্রহণ করা

স্মৃতি কূটনীতি (Memory Diplomacy):

যখন কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের সাথে নিজের অতীত ইতিহাসের সাদৃশ্য বা পূর্বের ভালো সম্পর্কের স্মৃতি প্রকাশ্যে এনে স্বীয় বৈদেশিক নীতির লক্ষ্য পূরণ করার চেষ্টা করে তখন তাকে স্মৃতি কূটনীতি বলে। স্মৃতি কূটনীতি সামসময়িক সম্পর্কের ওপর ঐতিহাসিক স্মৃতির প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে সম্পর্কের সেতুবন্ধন দৃঢ় করা, ও ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে সহযোগিতার জন্য একটি সাধারণ ভিত্তি স্থাপন করতে সাহায্য করে।

আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার কয়েকটি দেশে সম্প্রতি রাশিয়া নিজেদের প্রভাব আরও গভীর করেছে। বৈশ্বিক দক্ষিণ (Global South) রাশিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে এবং তারা ইউক্রেনকে পুরোপুরি সমর্থন দিচ্ছে না বরং দেশগুলো মস্কোর প্রতি নমনীয়তা দেখাচ্ছে। আফ্রিকায় রাশিয়া নিজেদেরকে ‘উপনিবেশবাদ-বিরোধী’ সংগ্রামের সংস্থা হিসেবে হাজির করছে। মস্কোর এই কৌশলকে ‘স্মৃতি কূটনীতি’ বলা হয়। বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের যে ইতিহাস সেটিকেই পুঁজি করছে রাশিয়া। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিজয় অর্জন করেছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন। সেই ইতিহাসকে এখন সামনে আনছে রাশিয়া। মস্কো এটাও বলছে যে আফ্রিকার কোনো দেশে তারা কখনো উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করেনি এবং সেখানে কোনো দাস ব্যবসার সঙ্গেও তারা জড়িত ছিল না। এছাড়া শীতল যুদ্ধ চলাকালে আফ্রিকার কয়েকটি দেশে উপনিবেশবাদ-বিরোধী লড়াইয়ে জোরালো সমর্থন দিয়েছিল রাশিয়া। দৃষ্টান্ত হিসেবে অ্যাঙ্গোলা ও মোজাম্বিকের কথা বলা যায়। আফ্রিকার উপনিবেশবাদ-বিরোধী সংগ্রামে মস্কোর সংহতি জানানোর পরম্পরা অনেক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।

Adhoc Diplomacy (অ্যাডহক/অস্থায়ী কূটনীতি)

অ্যাডহক কূটনীতি বলতে কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পদক্ষেপের একটি শৈলীকে বোঝায় যা নির্দিষ্ট, তাৎক্ষণিক এবং প্রায়শই অপ্রত্যাশিত সমস্যা বা সংকট মোকাবেলার জন্য কেস-বাই-কেস ভিত্তিতে ইম্প্রুভাইজ করা বা পরিচালিত হয়। এই পদ্ধতিতে, কূটনৈতিক এবং সরকারি কর্মকর্তারা পূর্ব-প্রতিষ্ঠিত আনুষ্ঠানিক চুক্তি বা দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার ওপর নির্ভর না করে উদীয়মান পরিস্থিতিতে প্রতিক্রিয়া জানায়। অ্যাডহক কূটনীতি সাধারণত এর নমনীয়তা, বাস্তববাদ এবং নিয়ম বা পদ্ধতির একটি নির্দিষ্ট সেটের অনুপস্থিতি দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। অ্যাডহক কূটনীতি স্বল্পমেয়াদি সমস্যাগুলির সমাধান এবং সংকট পরিচালনার ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে।

Coercive Diplomacy (চাপ প্রয়োগের কূটনীতি)

যখন কোনো একটি রাষ্ট্র বা কতগুলো রাষ্ট্র একত্র হয়ে নির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য সাধনের লক্ষ্যে অন্য কোনো রাষ্ট্রের ওপর শক্তি প্রয়োগ (সামরিক শক্তি) করে তখন তাকে coercive diplomacy বলে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের উদ্দেশ্যেই এই কূটনীতি ব্যবহার করা হয়।

জবরদস্তিমূলক কূটনীতির একটি উদাহরণ হলো ১৯৬২ সালে কিউবান ক্ষেপণাস্ত্র সংকট। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আবিষ্কার করেছিল যে সোভিয়েত ইউনিয়ন কিউবায় ক্ষেপণাস্ত্র সাইট তৈরি করছে। প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি কিউবার চারপাশে নৌ-অবরোধ আরোপ করেন যাতে আরো ক্ষেপণাস্ত্র আসা রোধ করা যায় এবং তিনি বিদ্যমান ক্ষেপণাস্ত্র অপসারণের দাবি জানান। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র শক্তি প্রয়োগের জন্য প্রস্তুত থাকলেও তারা আলোচনার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধান চেয়েছিল। কিউবা আক্রমণ না করার এবং শেষ পর্যন্ত তুরস্ক থেকে মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র অপসারণের মার্কিন প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন ক্ষেপণাস্ত্র অপসারণে সম্মত হলে সংকটের অবসান ঘটে।

Cultural Diplomacy (সাংস্কৃতিক কূটনীতি)

সাংস্কৃতিক কূটনীতি হলো এক ধরনের কূটনীতি যা একটি জাতির সাংস্কৃতিক গুণাবলি ব্যবহার করে, যেমন তার শিল্প, সঙ্গীত, সাহিত্য, খেলাধুলা, দর্শন, ঐতিহ্য এবং তার সংস্কৃতির অন্যান্য দিকগুলি। এছাড়াও, এটা অন্য দেশের সাথে তার সম্পর্ককে শক্তিশালী করে, বিশ্বাস তৈরি করে, পারস্পরিক বোঝাপড়াকে উন্নীত করে এবং সহযোগিতা বৃদ্ধি করে। এটি প্রায়শই কূটনীতির একটি নরম রূপ হিসেবে দেখা হয় যার লক্ষ্য সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক কার্যকলাপের মাধ্যমে বিদেশি সরকার এবং জনগণকে প্রভাবিত করা। সাংস্কৃতিক কূটনীতির একটি দুর্দান্ত উদাহরণ হলো ব্রিটিশ কাউন্সিল, যেটি এমন একটি সংস্থা যার লক্ষ্য হলো শিল্প ও সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে যুক্তরাজ্য এবং অন্যান্য দেশের মানুষের মধ্যে সংযোগ, বোঝাপড়া এবং বিশ্বাস গড়ে তোলা। ইউনেস্কো কর্তৃক সুন্দরবনসহ কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থানকে বিশ্ব-ঐতিহ্যের অংশ (World Heritage Site) অন্তর্ভুক্ত করা ইউনেস্কোতে আমাদের সাংস্কৃতিক কূটনীতির সফলতার কয়েকটি নিদর্শন হিসেবেও তুলে ধরা যায়।

Checkbook Diplomacy (চেকবুক ডিপ্লোমেসি)

চেকবুক কূটনীতি বলতে একটি বৈদেশিক নীতির কৌশলকে বোঝায় যেখানে একটি দেশ অর্থনৈতিক সাহায্য, ঋণ বা বিনিয়োগের মতো আর্থিক প্রণোদনা ব্যবহার করে, অন্যান্য জাতির সাথে কূটনৈতিক অনুগ্রহ এবং প্রভাব অর্জন করে। এটি একটি জাতির “চেকবুক” ব্যবহার করার তার কূটনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের মতো। চেকবুক কূটনীতির একটি মূল বৈশিষ্ট্য হলো যে এটি প্রাথমিকভাবে আলোচনা বা চুক্তির মতো ঐতিহ্যবাহী কূটনৈতিক সরঞ্জামের ওপর নির্ভর করে না, তবে অন্যান্য জাতির আচরণকে রূপ দেওয়ার জন্য অর্থনৈতিক শক্তির ওপর নির্ভর করে যদিও এই পদ্ধতিটি স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনে বেশ কার্যকর হতে পারে।

উদাহরণস্বরূপ: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন শীতল যুদ্ধের সময় অন্যান্য দেশগুলিকে দেওয়া আর্থিক সাহায্য, যার লক্ষ্য ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জন এবং প্রভাব বিস্তার করা। চেকবুক কূটনীতির আরেকটি উদাহরণ তাইওয়ান এবং চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতায় দেখা যায়। উভয় দেশই অন্যান্য দেশকে তাদের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন বা বজায় রাখতে রাজি করার জন্য অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিচ্ছে।

Dollar Diplomacy

২০ শতকের গোড়ার দিকে, বিশেষ করে উইলিয়াম হাওয়ার্ড টাফ্টের (১৯০৯-১৯১৩) রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন এই শব্দটি প্রায়শই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিতে শোনা যেত। ডলার কূটনীতির কেন্দ্রীয় ধারণাটি ছিল অর্থনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে, অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রদান করে এবং কখনও বা অর্থনৈতিক অবরোধের ভয়ভীতি দেখিয়ে স্বার্থ হাসিল করা। মূলত আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নের এই কৌশল নিয়েছিল লাতিন আমেরিকা যার উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোকে অর্থনৈতিক লোভ দেখিয়ে পকেটে নেওয়া এবং মার্কিন নীতির সমর্থনের পাশাপাশি আমেরিকান পণ্যের জন্য বিদেশি বাজার উন্মুক্ত করা। সৌদি আরব বিভিন্ন মুসলিম দেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য যে কূটনীতি চালায় তাকে বলা হয় পেট্রোডলার কূটনীতি। বর্তমানে ইরানের আধিপত্যবাদকে (Hegemony) ঠেকাতে সৌদি আরব পেট্রোডলার কূটনীতি চালাচ্ছে।

Gunboat Diplomacy (গানবোট কূটনীতি)

গানবোট কূটনীতি হলো যুদ্ধজাহাজ এবং গানবোটের ব্যবহার করে সামরিকভাবে অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী বা দুর্বল দেশকে ভয় দেখানো, যতক্ষণ না তারা যুদ্ধজাহাজ মোতায়েনকারী দেশ যা-কিছু চায় তাতে সম্মত হয়। এটি মূলত প্রতিপক্ষ দেশের সমুদ্রসীমার আশেপাশে বিভিন্ন যুদ্ধজাহাজ ও নৌবহর পাঠিয়ে চাপে রাখার একটি কূটকৌশল। গানবোট কূটনীতির মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে যুদ্ধ এড়িয়ে সুবিধা আদায় করে নেওয়া হয়। সাধারণত দুর্বল ও ছোট দেশগুলোর বিপরীতে এ-ধরনের সামরিক শক্তি প্রদর্শন ও আগ্রাসন সম্ভব। মার্কিনিরা শীতল যুদ্ধের সময় গানবোট কূটনীতিতে প্রত্যাবর্তন করেছিল। এই সময় দেশটি লাতিন আমেরিকার বেশ কিছু দেশের বিপক্ষে এ-ধরনের আগ্রাসন প্রদর্শন করেছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট হাইতি, পানামা, কলম্বিয়া ও নিকারাগুয়ার মতো ছোট দেশগুলোর সরকারকে ভয় দেখানোর জন্য এই গানবোট কূটনীতি ব্যবহার করেছিলেন। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সময়েও পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আমাদের বিপক্ষে গানবোট কূটনীতির আশ্রয় নিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত সেই হীন চেষ্টা ব্যর্থ হয়। মার্কিনদের দেখাদেখি উনিশ ও বিশ শতকে অনেক সামরিক শক্তিধর দেশ গানবোট কূটনীতির মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করেছে।

বিগ স্টিক কূটনীতি

থিওডোর রুজভেল্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন “বিগ স্টিক কূটনীতি” শব্দটি প্রায়ই শোনা যেত। কূটনীতির এই পদ্ধতিটিকে কখনও কখনও “গানবোট কূটনীতি” হিসেবেও উল্লেখ করা হয়। আলোচনা এবং বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধানের ওপর জোর দেওয়ার সাথে সাথে, তিনি যখন প্রয়োজন মনে করতেন তখন সামরিক শক্তি ব্যবহার করার ইচ্ছাও পোষণ করতেন। এর একটি উদাহরণ ছিল পানামা খাল নির্মাণ, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রকল্পটি সহজতর করার জন্য কলম্বিয়া থেকে পানামার স্বাধীনতাকে সমর্থন করেছিল। এই নীতির পেছনে কেন্দ্রীয় ধারণাটি ছিল শান্তিপূর্ণভাবে কিন্তু সামরিক শক্তির অন্তর্নিহিত হুমকির সাথে আমেরিকান স্বার্থ রক্ষায় আলোচনা করা। রুজভেল্টের বিখ্যাত প্রবাদটি ছিল, “মৃদুভাবে কথা বলুন এবং একটি বড় লাঠি বহন করুন।” মোটকথা, তিনি বিশ্বাস করতেন যে কূটনীতিকে সামরিক শক্তি দ্বারা সমর্থন করা উচিত।

বিগ স্টিক কূটনীতির মূল বৈশিষ্ট্যগুলির মধ্যে রয়েছে:

  • শক্তি প্রদর্শনের সাথে আলোচনা;
  • প্রয়োজনে সামরিক শক্তির ব্যবহার;
  • আন্তর্জাতিক সংঘাতে মধ্যস্থতা;
  • আমেরিকান স্বার্থের সুরক্ষা;
  • ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা।

পঞ্চশীলা নীতি:

পঞ্চশীলা কথাটি এসেছে গৌতম বুদ্ধের পঞ্চ আচরণবিধি থেকে, যেটি সংঘভুক্ত বৌদ্ধ ভিক্ষুদের অবশ্য পালনীয় ছিল। কিন্তু এখন এটি ব্যবহৃত হয় একটি রাজনৈতিক অর্থে। ১৯৫৫ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু, চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই, এবং ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট ড. আহমেদ সুকর্নর নেতৃত্বে ইন্দোনেশিয়ার বান্দুং-এ এশিয়া ও আফ্রিকা মহাদেশের ২৯টি দেশের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলন থেকে Non-Alligned Movement (NAM) প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রসমূহ যে পাঁচটি নীতি মেনে চলার ব্যাপারে অঙ্গীকারবদ্ধ হয় তা-ই পঞ্চশীলা নীতি নামে প্রসিদ্ধ।

নীতিগুলো হলো:

  1. ১পরস্পরের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধা;
  2. ২পারস্পরিক অনাগ্রাসন;
  3. ৩পরস্পরের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করা;
  4. ৪সমতা ও পারস্পরিক কল্যাণ;
  5. ৫শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।

Democratic Diplomacy (গণতান্ত্রিক কূটনীতি)

পররাষ্ট্র এবং কূটনৈতিক ব্যাপারে জনমতের প্রাধান্য দেওয়াই হলো গণতান্ত্রিক কূটনীতি। জনগণ ক্রমাগতভাবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উৎসাহী হয়ে পড়ে। ফলে পররাষ্ট্র এবং কূটনৈতিক ব্যাপারে তারা গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিদের মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। এটাই গণতান্ত্রিক কূটনীতি নামে পরিচিত। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে যেহেতু জনগণকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা সম্ভব নয়, তাই শিক্ষিত ও সচেতন মানুষদের দায়িত্ব হওয়া উচিত এসব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যথোপযুক্ত মতামত গড়ে তোলা এবং সরকারের পথপ্রদর্শক হিসেবে কাজ করা। ডেমোক্র্যাটিক ডিপ্লোম্যাসির প্রবক্তা হলেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন। তিনি তার বিখ্যাত ‘চৌদ্দ দফা’-তে ১৯১৮ সালের জানুয়ারিতে বলেন: “I feta a, Open covenants of peace, openly arrived at, after which there shall be no private international understandings of any kind but diplomacy shall proceed always frankly and in the public view.”

রন্ধনসংক্রান্ত কূটনীতি বা গ্যাস্ট্রোডিপ্লোম্যাসি

মানুষের মন জয় করার জন্য খাবারের বোধহয় বিকল্প নেই। সাধারণ মানুষ তো বটেই, অন্য দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই খাবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। গ্যাস্ট্রোডিপ্লোম্যাসি হলো অন্যান্য দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য খাদ্যের ব্যবহার। রন্ধন বা খাদ্যসংক্রান্ত কূটনীতি অবশ্যই পুরোপুরি একটি দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত এবং ভিন্নতা ও স্বাদের মাধ্যমে জয় করে নিতে পারে ভিনদেশিদের মনও। ঠিক এ ব্যাপারটিকেই পুঁজি করে প্রাচীনকাল থেকে গ্যাস্ট্রোডিপ্লোম্যাসি পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় এবং দক্ষিণ কোরিয়া ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো তাদের নাগরিকদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর আগে তাদের জাতীয় খাবার রান্না করার প্রশিক্ষণ দেয়। এবার বুঝতে পেরেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে কেন এত বেশি থাই, কোরিয়ান খাবার জনপ্রিয়?

RU

  • ডিজিটাল কূটনীতি: ডিজিটাল কূটনীতির কোনো নির্দিষ্ট অর্থ নেই। সংক্ষেপে বলা যায়, এটি একটি ‘ক্যাটাল’ শব্দ, যা কূটনীতির জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহারের উল্লেখ করে। এটি ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া বা কেবল ডিজিটাল ডিভাইস হতে পারে। এটি সেলফি তোলার মতো সহজ কাজও হতে পারে। কূটনেতিক নিয়মের আওতায় এক দেশের সরকারকে অন্য দেশের নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলতে দেওয়া হয় না। ডিজিটাল কূটনীতি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধরন বদলেছে। কল্পনা করুন যে, উত্তর কোরিয়া সরকারের টুইটগুলো একটি দক্ষিণ কোরিয়া নাগরিক জবাব দিয়েছে এবং উত্তর কোরিয়া সরকার তার জবাব দিয়েছে। এটি ডিজিটাল কূটনীতির উদাহরণ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরের সময় বাংলায় এবং চীন সফরে ম্যান্ডারিন ভাষায় টুইট করেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন টুইটারে টুইট করেন, তখন তারা ডিজিটাল কূটনীতি ব্যবহার করেন। কখনও কখনও বিদেশি সরকারগুলো টুইটারে তার মন্তব্যের জবাব দিয়েছে। অন্যান্য সময়ে তারা টেলিভিশন সাক্ষাৎকারের সময় তার টুইটগুলোয় প্রতিক্রিয়া জানায়। সাক্ষাৎকারের সময় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে বিদেশি সরকারও টুইট করেছে।
  • ক্রিকেট কূটনীতি ভারত ও পাকিস্তানের ‘ক্রিকেট’ খেলার চেয়ে বেশি কিছু। দুই দেশের ক্রিকেট ম্যাচ ঘিরে সীমান্তে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এটি দুই দেশের কাছে রাজনীতি থেকে জাতীয় অভিমান পর্যন্ত সবকিছুই ক্রিকেট-কেন্দ্রিক। যা-ই হোক, উভয় দেশই তাদের সম্পর্কের উন্নতির জন্য এ খেলাটি ব্যবহার করে আসছে।
  • হাতি কূটনীতি হাতি কূটনীতি একচেটিয়াভাবে ব্যবহার করে শ্রীলঙ্কা। দক্ষিণ এশিয়ার এই দ্বীপরাষ্ট্র হাতি উপহার দেওয়ার মাধ্যমে সম্পর্কোন্নয়ন ও স্থাপনের কাজটি শুরু করে থাকে। শ্রীলঙ্কার কূটনীতির পক্ষে হাতি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে, দ্বীপরাষ্ট্রটি দাবি করে, তারা শুধু ওইসব দেশকেই হাতি দেয়, যাদের তারা বিশেষ বন্ধু হিসেবে বিবেচনা করে। ২০১০ সালে দক্ষিণ কোরিয়াকে দুটি প্রাপ্তবয়স্ক হাতি দেয় দেশটি, যেগুলোর একটি পুরুষ ও অন্যটি মেয়ে হাতি ছিল। ২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসে জাপানে রাষ্ট্রীয় সফরের সময় দুটি বাচ্চা হাতি উপহার দেন জাপান সরকারকে।
  • Machiavellian Diplomacy জাতীয় লক্ষ্য অর্জনের লক্ষ্যে কৌশলী, প্রতারণাপূর্ণ, এবং ষড়যন্ত্রমূলক পদ্ধতির আশ্রয় নিয়ে পরিচালিত কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে Machiavellian Diplomacy বলে। নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি তার বিখ্যাত বই ‘দি প্রিন্স’-এ বলেছেন, রাজনৈতিক ক্ষমতা ধরে রাখা ও এক্ষেত্রে বিজয়ী হওয়ার জন্য অসৎ পন্থার অবলম্বন করা বৈধ।
  • Open Diplomacy (প্রকাশ্য কূটনীতি) প্রকাশ্য কূটনীতির মূলকথা হলো এই যে, কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনা ও কার্যকলাপ গোপন না রেখে জনগণের কাছে প্রকাশ করতে হবে। প্রকাশ্য কূটনীতি জনমতের ওপর গুরুত্ব আরোপ করে। তাই প্রকাশ্য কূটনীতিকে অনেক সময় গণতান্ত্রিক কূটনীতিও বলা হয়ে থাকে। ১৯১৮ সালের ৮ জানুয়ারি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন যে ১৪ দফা প্রস্তাব দিয়েছিলেন তার প্রথম দফাতেই তিনি উল্লেখ করেছিলেন প্রকাশ্য কূটনীতির বিষয়টি। কেননা প্রকাশ্য কূটনীতি ছাড়া আধুনিক বিশ্বে শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিধান করা প্রায় অসম্ভব। প্রকাশ্য কূটনীতির রক্ষাকবচ জাতিসংঘ নিজেই।
  • সম্মেলন কূটনীতি: বিভিন্ন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধান, বিদেশমন্ত্রী ও পদস্থ কর্মচারী অথবা কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা যখন কোনো আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধানের জন্য কোনো সম্মেলনে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধানসূত্র বের করার চেষ্টা করেন, তখন তাকে সম্মেলনের মাধ্যমে কূটনীতি বলে আখ্যা দেওয়া হয়।
  • Ping Pong Diplomacy (পিং পং কূটনীতি) পিংপং কূটনীতির মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতিতে অত্যন্ত প্রভাব বিস্তারকারী একটি ঘটনা ছিল। ১৯৪৯ সালে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবকে কেন্দ্র করে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন হয়। ১৯৭১ সালের ৬ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের একটি টেবিল টেনিস দল জাপানের নাগোয়াতে ৩১তম বিশ্ব টেবিল টেনিস প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। এসময় মার্কিন টেবিল টেনিস দলকে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়। মার্কিন ক্রীড়াবিদরা এ আমন্ত্রণে সাড়া দেন এবং ১০-১৭ এপ্রিল চীনে অবস্থান করেন। এসময় তারা

চীন খেলোয়াড়দের সাথে খেলায় অংশ নেন এবং চীনের বিভিন্ন স্থান ভ্রমণ করেন। ১৯৭১ সালের ১৪ এপ্রিল চৌ এন লাই ওই দলকে আপ্যায়ন করেন এবং বলেন, “You opened a new phase of relation between PRC and US.” এ সফরের মধ্য দিয়ে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের উন্নতি হয় এবং প্রেসিডেন্ট নিক্সনের ঐতিহাসিক চীন সফরের ক্ষেত্র তৈরি হয়। চীনা ভাষায় টেবিল টেনিস খেলাকে বলা হয় “পিং পং”। এ কূটনীতিই পিং পং কূটনীতি নামে নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে ১৯৭৯ সালের পর ফের চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

জন কূটনীতি (Public Diplomacy/Peoples Diplomacy/Citizen Diplomacy)

কোনো দেশের সরকার যখন দেশের জনগণকে দিয়ে অন্য দেশের জনগণের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন বা উন্নয়নের চেষ্টা চালায়, তখন সেই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে বলা হয় জন কূটনীতি। রাষ্ট্র সাধারণত অন্য দেশের মিডিয়া ও সিভিল সোসাইটির সাথে সম্পর্ক রক্ষা করা এবং জাতীয় স্বার্থ উদ্ধারের জন্য পাবলিক ডিপ্লোমেসির আশ্রয় নিয়ে থাকে। এই কূটনীতির কৌশল নির্ধারণ করে দেয় সরকার। আলোচ্যসূচিও নির্ধারণ করে দেয় সরকার। ১৯৬৫ সালে লন্ডন টাইমস পত্রিকায় প্রথম এই কূটনীতি সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে Public Diplomacy-এর গুরুত্ব অনেক বেশি বেড়ে গেছে।

উদাহরণস্বরূপ: আমেরিকার বাজারে বর্তমানে বাংলাদেশের GSP স্থগিত রয়েছে। এখানে আমেরিকা বাংলাদেশকে যে শর্ত আরোপ করেছিলো GSP ফিরে পাবার জন্য বাংলাদেশ তার বেশিরভাগ শর্তই পূরণ করলেও আমেরিকা বাংলাদেশকে এখনও GSP সুবিধা ফিরিয়ে দেয়নি। এই অবস্থায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা যদি আমেরিকার ব্যবসায়ী, সিভিল সোসাইটি এবং আমেরিকার বিভিন্ন কমিউনিটির সাথে GSP ফিরে পাবার ব্যাপারে জোর লবিং চালায় কিংবা আলাপ-আলোচনা বা কলা-কৌশল পরিচালনা করে তখন এই কলা কৌশলকে বা পদক্ষেপকে বলা হবে Public Diplomacy।

  • Government
  • PublicAffairs
  • Public Diplomacy
  • Non Governmental Actors(individuals, civil society,corporations, NGOs, etc.)

Personal Diplomacy (ব্যক্তিগত কূটনীতি)

রাষ্ট্রপ্রধান, প্রধানমন্ত্রী বা পররাষ্ট্রমন্ত্রী যখন ব্যক্তিগত উদ্যোগে কূটনৈতিক কার্যক্রম চালায় তথা অন্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক তৈরির বা উন্নয়নের চেষ্টা চালায় তখন তাকে বলা হয় ব্যক্তিগত কূটনীতি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে ও যুদ্ধোত্তরকালে বিভিন্ন সমস্যাবলী নিয়ে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা ব্যক্তিগত আলাপ-আলোচনা করেন। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশের মধ্যে আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কে গতিশীলতার পাশাপাশি ব্যক্তিগত কূটনীতি নতুন মাত্রা লাভ করেছে। ব্যক্তিগত কূটনীতির অজস্র উদাহরণ রয়েছে। ১৯৪১ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রোজভেল্ট এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট স্টালিন এই ধরনের কূটনীতি চালান। আবার ১৯৭২ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই এর ব্যক্তিগত যোগাযোগ ব্যক্তিগত কূটনীতির প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

Preventive Diplomacy (নিবর্তক কূটনীতি)

প্রতিরক্ষামূলক কূটনীতি হলো এমন একটি ডিপ্লোম্যাটিক পদক্ষেপ যা সংঘাত বা সংগ্রামের আগেই এসব বিবাদমূলক অবস্থাকে প্রতিরোধ করার লক্ষ্যে গ্রহণ করা হয়। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে বিবাদ এবং সংঘর্ষ সামনে আসার আগেই তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করা হয়। সংঘাত এড়িয়ে সমাধানের পথ বেছে নেওয়াই এই কূটনীতির মূল উদ্দেশ্য।

জাতিসংঘের সনদ ৬-এর আর্টিকেল ৩৩ নং অনুচ্ছেদে শান্তিপূর্ণ মীমাংসার কথা বলা হয়েছে এবং বিবাদ মীমাংসার ব্যাপারে দিক নির্দেশনা ও নিয়ম কানুন দেওয়া হয়েছে। ১৯৯২ সালে জাতিসংঘ মহাসচিব বুট্রোস ঘালি যে “Agenda for peace”-এর কথা বলেন এখানে প্রতিরক্ষামূলক কূটনীতির উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে।

উদাহরণ: পৃথিবীর প্রথম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ছিল The United Nations Preventive Deployment Force (UNPREDEP) যা ১৯৯৫-১৯৯৯ সালে মেসিডোনিয়াতে জাতিসংঘ কর্তৃক নেওয়া হয়।

উদ্দেশ্য:

  1. ১প্রতিরক্ষামূলক কূটনীতি দুটো দলের মধ্যে বিবাদমান বিতর্কিত অবস্থা থেকে সুরক্ষা দিতে কাজ করবে।
  2. ২কোনো সংঘাত যাতে সশস্ত্র সংঘর্ষের দিকে না যায়, সেদিকে লক্ষ্য রাখা।
  3. ৩যখন দুটি পক্ষ বিবাদে জড়িয়ে পড়ে, তখন প্রতিরক্ষামূলক কূটনীতির মাধ্যমে চেষ্টা করতে হবে যাতে সে বিবাদটি সীমাবদ্ধ আকারে থাকে।

প্রতিরক্ষামূলক ডিপ্লোমেসির কার্যকর পদ্ধতিগুলো হলো:

  • মধ্যস্থতা এবং আলোচনার ব্যবস্থা করা;
  • প্রাথমিক সতর্কতা জারি করা;
  • শাটল ডিপ্লোমেসির মাধ্যমে সংঘাতমূলক পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো;
  • বিবাদ সমাধানে ওয়ার্কশপ করে মৌলিক সমস্যাগুলি ঠিক করা এবং আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা;
  • ট্র্যাক-২ ডিপ্লোমেসি বাস্তবায়ন করা;
  • প্রতিরক্ষামূলক শান্তি মিশন পরিচালনা করা।

প্রতিরোধমূলক কূটনীতির বিভিন্ন শাখা:

1. Conflict Analysis 5. Encourage Dialogue
2. Diplomatic action 6. Limit the spread of conflicts
3. Planning and supporting the work of peace 7. Peaceful resolution
4. Good office 8. Support states and Regional Actors

Quiet Diplomacy (নীরব কূটনীতি)

Quiet Diplomacy হলো গোপন আলোচনার মাধ্যমে (not taking public positions/postures) বা কোনো নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে অন্য রাষ্ট্রের আচরণকে প্রভাবিত করার প্রচেষ্টা। এক্ষেত্রে জনসম্মুখে আলোচনার পরিবর্তে ব্যাক চ্যানেলিংয়ের ওপর নির্ভর করতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড়ো, শক্তিশালী দেশগুলোও Quiet Diplomacy ব্যবহার করে। এ-বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট Theodore Roosevelt বলেন, “speak softly and carry a big stick.”

যেমন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ইস্যুতে বাংলাদেশ এখন নীরব কূটনীতি বা ‘সাইলেন্ট ডিপ্লোমেসি’ অবলম্বন করছে। তাই এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতির বাইরে সরকারের কোনো পর্যায় থেকে কথা না বলার নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

Secret Diplomacy (গোপন কূটনীতি)

গোপন কূটনীতি বলতে কূটনীতির সেই পদ্ধতিকে বোঝায় যেখানে কূটনৈতিক আলোচনা ও কার্যাবলি গোপন রাখা হয়। গোপন কূটনীতির ক্ষেত্রে কূটনীতি পরিচালনায় জনগণের কোনো ভূমিকা থাকে না। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে পর্যন্ত পৃথিবীতে গোপন কূটনীতির প্রচলন ছিল। রাষ্ট্রনেতারা এবং কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা গোপনে সলাপরামর্শ চালিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন এবং জনগণকে সেই সিদ্ধান্ত কেবল জানানো হতো। আলোচনার কোনো পর্যায়ে জনগণের অংশগ্রহণের কোনো সুযোগ ছিল না। ঊনবিংশ শতাব্দীতে মনে করা হতো কূটনীতির এই গোপন পদ্ধতি ক্ষমতার ভারসাম্য ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্ব রক্ষায় সহায়ক।

গোপন কূটনীতির সুবিধা:

  • আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে সাফল্যের অন্যতম পূর্বশর্ত হলো গোপনীয়তা (Secrecy is the key to success in diplomacy.)1
  • গোপন কূটনীতিতে দর কষাকষি বা ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে সুবিধা আদায় করা সম্ভব হয়।
  • কূটনীতি গোপনীয়ভাবে পরিচালিত হলে দ্রুত সিদ্ধান্তগ্রহণ সম্ভব হয়।
  • কূটনীতির লক্ষ্য ও কার্যকলাপ প্রকাশিত হলে তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল স্বার্থগোষ্ঠী সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে কূটনৈতিক কার্যকলাপ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

গোপন কূটনীতির অসুবিধা:

  • গোপন কূটনীতিকে অনেকে ষড়যন্ত্রমূলক পদ্ধতি বলে সমালোচনা করেন।
  • গোপন কূটনীতি অনেক সময় বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার পথে অন্তরায় হিসাবে কাজ করে।
  • গণতন্ত্র ও গোপনীয়তা পরস্পরবিরোধী। হিটলার, মুসোলিনি, চিয়াং কাই শেক প্রভৃতি স্বৈরাচারী শাসকদের আমলে কূটনৈতিক কার্যকলাপ পরিচালিত হয় চূড়ান্ত গোপনে এবং জনগণকে এসব ব্যাপারে পুরোপুরি অন্ধকারে রাখা হয়। এর জন্য দেশটিকে যথেষ্ট মূল্য দিতে হয়েছিল।

Shuttle diplomacy

কোনো আন্তর্জাতিক সমস্যা বা দুটি দেশের মধ্যকার চলমান সংঘাত সমাধানের জন্য মধ্যস্থতাকারী কোনো দায়িত্বপ্রাপ্ত পক্ষ যখন বারবার এক দেশ থেকে অন্য দেশে সফর করেন, তখন তাকে Shuttle diplomacy বলে। যেমন, ১৯৭৩ সালে যখন তৃতীয় আরব-ইসরাইল যুদ্ধ হয়, তখন আরব দেশগুলোর সাথে ইসরাইলের কূটনৈতিক আলাপ-আলোচনা বন্ধ হয়ে যায়। এ অবস্থায় ১৯৭৪ সালের জানুয়ারি মাসে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী (Secretary of the State) হেনরি কিসিঞ্জার (Henry Kissinger) ইসরাইলের পক্ষ নিয়ে বারবার মধ্যপ্রাচ্য সফর করেন এবং আরব দেশগুলোর সাথে আলোচনা করেন। New York times ১৯৭৪ সালে এ-ধরনের সফরের ক্ষেত্রে Shuttle শব্দ প্রথম ব্যবহার করেন। তখন থেকে এই ধরনের তৎপরতাকে Shuttle diplomacy বলে।

Sideline diplomacy (সাইডলাইন কূটনীতি)

আন্তর্জাতিক কোনো সম্মেলন চলাকালীন যখন রাষ্ট্রনায়কেরা মূল এজেন্ডার বাইরে গিয়ে একে-অপরের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে সাইডলাইনে আলোচনা করে তখন তাকে সাইডলাইন কূটনীতি বলে। মূল আলোচনার বাইরে এ-সমস্ত আলোচনা আনুষ্ঠানিকভাবে হয়। বর্তমান সময়ে এই কূটনীতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী প্রতি সম্মেলনেই সাইডলাইন বা করিডোর কূটনীতি চালান। যেমন, ৭৪তম অধিবেশনের সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। সেখানে নাগরিকপুঞ্জি (NRC) নিয়ে আলোচনা করেন। নরেন্দ্র মোদি NRC নিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্বিগ্ন হতে নিষেধ করেন।

হোস্টেজ ডিপ্লোমেসি (Hostage Diplomacy)

সরাসরি কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান অন্যান্য দেশের সঙ্গে মিলে পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে আমেরিকাকে বের করে নেওয়ার পর থেকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হবার পরেও জো বাইডেন সেই চুক্তি পুনর্নবাল করেননি। কিন্তু নেপথ্যে ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে। সেই ‘নীরব কূটনীতি’-র সুফল হিসেবে ইরান পাঁচ মার্কিন বন্দিকে মুক্তির বিনিময়ে তাদের জব্দকৃত ৬০০ কোটি ডলার ফেরত পাবে। একে ‘হোস্টেজ ডিপ্লোমেসি’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন অনেকে। সম্প্রতি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এ বন্দি বিনিময় ইস্যুতে সমঝোতা হয়। সেখানে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ৫ বন্দির বিনিময়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় আটকে থাকা তেহরানের ৬০০ কোটি ডলার ছাড় করাতে হবে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে পেট্রোলিয়াম বিক্রি করে প্রাপ্য সেই অর্থ দক্ষিণ কোরিয়ায় জব্দ করা হয়েছিল। এবার কাতারে বিশেষ এক অ্যাকাউন্টে সেই অর্থ পাঠানো হবে। একমাত্র খাদ্য ও ওষুধপত্র কেনার মতো মানবিক প্রয়োজন মেটাতে ইরানের সরকার সেই ইউরো অ্যাকাউন্ট থেকে অর্থ ব্যয় করতে পারবে। উল্লেখ্য, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমলেও মার্কিন বন্দি মুক্তির বিনিময়ে ইরানের প্রাপ্য নগদ ৪০ কোটি ডলার হস্তান্তর করা হয়েছিল।

কৃষি কূটনীতি/ছাগল কূটনীতি

সম্প্রতি ব্রুনেইয়ের সুলতান হাজি হাসানাল বলকিয়াহ মুইজ্জাদ্দিন ওয়াদদৌল্লাহকে উপহার হিসেবে পাঠানো হয়েছে ১৫টি ছাগল। সুলতানকে এক জোড়া চিত্রল হরিণ, এক জোড়া ময়ূর এবং এক জোড়া ময়না উপহার দিয়েছে বাংলাদেশ। ব্রুনেইয়ের সুলতানকে ছাগল উপহারের বিষয়টিকে ‘কৃষি কূটনীতির’ অংশ হিসেবে অভিহিত করেছেন কয়েকজন কূটনীতিক। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের খাসির মাংস খাওয়ার পর এর স্বাদ নিয়ে প্রশংসা করেন ব্রুনেইয়ের সুলতান। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ শুরু হয়। এবারের সফরে সব প্রস্তুতি শেষ করে উপহার হিসেবে তা ব্রুনেইতে পাঠানো হয়েছে। অনেকেই আবার এটিকে ছাগল কূটনীতি হিসেবে অভিহিত করছেন। মূলত ব্রুনেইয়ের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্দেশ্যেই সরকার এই পদক্ষেপ নেয়।

❑ সালামি স্লাইসিং

সালামি স্লাইসিং হলো প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে ছোট সামরিক অভিযান পরিচালনা করে বিশাল এলাকা দখল করা। অভিনব এই সামরিক কৌশল অবলম্বন করে প্রতিবেশীদের থেকে একটু একটু করে বিস্তৃত অঞ্চল ছিনিয়ে নিচ্ছে চীন। প্রতিবেশী রাষ্ট্র বুঝে ওঠার আগেই আগ্রাসী রাষ্ট্রটি অল্প অল্প করে বিশাল অঞ্চলের দখল নেয়। স্টালিনপন্থী হাঙ্গেরির স্বৈরশাসক Mátyás Rákosi এই কৌশলের নামকরণ করেন। উল্লেখ্য, সালামি একটি উপাদেয় আমিষ জাতীয় খাবার যা একবারে না খেয়ে টুকরো টুকরো করে খেতে হয়। লাদাখ থেকে শুরু করে অরুণাচল প্রদেশ পর্যন্ত বিতর্কিত ভূখণ্ডে দু-পা এগিয়ে এক পা পিছিয়ে যাওয়ার ‘সালামি স্লাইসিং’ নীতি নিয়েছে লালফৌজ। চীন এই ‘সালামি স্লাইসিং’ কৌশলের মাধ্যমে নেপাল এবং ভুটানের সীমান্ত এলাকায় বিস্তৃত অঞ্চল দখল করেছে বলে জানা গিয়েছে। উদাহরণ:

  1. ১দক্ষিণ চীন সাগরের ছোট ছোট নানা বিবাদপূর্ণ দ্বীপে চীনের উপস্থিত বাড়ানোকে সালামি স্লাইসিং-এর উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
  2. ২ক্রিমিয়া দখল, দোনেস্ক ও লুহানস্কে রুশপন্থীদের রাজনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দেওয়া কিংবা স্বীকৃতি দেওয়া, সেইসাথে বেলারুশ ও ইউক্রেন সীমান্তের নিকট দীর্ঘসময় ধরে ছোট ছোট করে নিজেদের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনকে ঘিরে ফেলার প্রক্রিয়াকেও রুশ সালামি স্লাইসিং-এর উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

❑ ড্রোন কূটনীতি

ইরানি সরকার কৌশলগত সামরিক সম্পদ হিসাবে ড্রোনের ওপর ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। যেহেতু ড্রোনগুলি প্রচলিত ফাইটার এয়ারক্রাফ্টের তুলনায় অনেক সস্তা এবং যখন তখন শত্রু-লাইনের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করার ক্ষমতা রাখে, তাই এটা অনেক দেশেই বিশেষ করে রাশিয়ায় অত্যন্ত জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। ইরান ড্রোন সরবরাহের মাধ্যমে প্রতিবেশী দেশ-সহ অনেক দেশের সাথে তার সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটাচ্ছে এবং তার আঞ্চলিক নীতিগুলি বাস্তবায়ন করছে, একেই বিশেষজ্ঞরা ড্রোন কূটনীতি বলে আখ্যা দিচ্ছেন। ইরানের ড্রোন কূটনীতি এই অঞ্চলে তাকে আরও বেশি শক্তিশালী করে তুলছে এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি করছে।

ইরানের পাশাপাশি তুরস্কও একই ধরনের ড্রোন কূটনীতি বাস্তবায়ন করছে। তুরস্ক ও ইউক্রেনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সামরিক অংশীদারিত্ব এর উদাহরণ।

❑ আম কূটনীতি

উপমহাদেশের আমের সুনাম আছে বিশ্বজুড়ে। এ কারণে উপহার হিসেবে আমের ব্যবহারও পুরোনো। ভারতবর্ষে মোগল আমল থেকে এই আমের সঙ্গে ক্ষমতা, কূটনীতি ও আনুগত্যের যোগসূত্রের নানা নজির রয়েছে। মূলত আম উপহার হিসেবে পাঠিয়ে কোনো দেশের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক উন্নয়ন করাকেই আম কূটনীতি বলে। ‘আম কূটনীতির’ অংশ হিসেবে সম্প্রতি স্পেনসহ তিন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বাংলাদেশের সুস্বাদু আম্রপালি আম উপহার হিসেবে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। তাছাড়া ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য উপহার হিসেবে প্রায়ই আম পাঠানো হয়। স্বভাবতই এটি একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ। ভারতে আম কূটনীতির সূচনা হলেও তার চর্চা সবচেয়ে বেশি করেছে পাকিস্তান। প্রায় প্রতিবছরই পাকিস্তানের নেতারা ভারতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধী নেতাদের জন্য আম পাঠিয়ে থাকেন।

ফুটবল কূটনীতি

খেলাধুলার রাজনীতি-অর্থনীতি-কূটনীতি যে কতটা সফল ও সক্ষম হতে পারে, তার সর্বশেষ উদাহরণ তৈরি করেছে কাতারে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ফুটবল-২০২২। কাতার বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী বিশ্বখ্যাত ফুটবল দল আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের প্রতি বাংলাদেশের অগণিত ফুটবলপ্রেমী বিশেষ করে তরুণদের তীব্র আবেগমাথিত সমর্থনের প্রেক্ষিতে দেশ-দুটির সরকার ও জনগণ উদ্বেলিত হয়েছেন। বাংলাদেশের ফুটবলপ্রেমী মানুষের বড়ো একটি অংশ আর্জেন্টাইন সমর্থক। আর্জেন্টিনার জয়ে মিছিল-সমাবেশ, পতাকা ওড়ানো ইত্যাদি আর্জেন্টিনাবাসীর গোচরে ছিল না বললেই চলে। তবে সম্প্রতি ফেসবুক-টুইটার-ইউটিউবের কল্যাণে বাংলাদেশে আর্জেন্টাইন ফুটবলের জনপ্রিয়তা বিশ্ববাসী বিশেষত, আর্জেন্টিনাবাসীর নজরে এসেছে। ফিফা বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে নিঃস্বার্থ সমর্থনে আর্জেন্টিনাবাসী মুগ্ধ হয়েছে। আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন তাদের ভেরিফায়েড টুইটার ও ফেসবুক পেজে বাংলাদেশিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। কয়েক হাজার মাইল দূরে অবস্থিত একটি দেশের প্রতি আরেকটি দেশের এ-ধরনের সমর্থনকে ফিফা ‘পাওয়ার অব ফুটবল’ বলে উল্লেখ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় আর্জেন্টিনা ঢাকায় আবার তাদের দূতাবাস চালু করেছে। আর এই দূতাবাস খোলার পেছনে আছে ফুটবল কূটনীতির অসাধারণ এক গল্প। বাংলাদেশ জুড়ে বিশ্বকাপের সময় আর্জেন্টিনা সমর্থকদের সমর্থন দেশটিকে বাধ্য করেছে ঢাকায় দূতাবাস খুলতে।

স্ট্রিং অফ পার্লস

‘স্ট্রিং অফ পার্লস’ হলো ভারত মহাসাগর অঞ্চল (IOR)-কে কেন্দ্র করে চীনা ভূ-রাজনৈতিক একটি তত্ত্ব, যা বেইজিংয়ের বিশাল অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের একটি কৌশল। সুনির্দিষ্টভাবে, এটি চীনা মূল ভূখণ্ড এবং পোর্ট সুদানের মধ্যবর্তী ভারত মহাসাগরে পড়া দেশগুলিতে চীন দ্বারা তৈরি চীনা সামরিক ও বাণিজ্যিক সুবিধাগুলির নেটওয়ার্ককে বোঝায়। চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অগ্রগতি চলমান রাখতে সামুদ্রিক রুট এবং “চোক পয়েন্ট”-এর ভূ-কৌশলগত নিরাপত্তার প্রয়োজন। প্রতিটি “মুক্তা” ভারত মহাসাগরের উপকূলে একটি নির্দিষ্ট বন্দর প্রকল্পের প্রতিনিধিত্ব করে। নিকোলাস স্পাইকম্যান এবং আলফ্রেড মাহনের ধ্রুপদী ভূ-রাজনৈতিক তত্ত্ব অনুসরণ করে, চীন দৃশ্যত আফ্রো-ইউরেশিয়ায় এবং সেখান থেকে বাকি বিশ্বের মধ্যে একটি প্রভাব রাখার জন্য এশিয়ান এবং আফ্রিকান উপকূলরেখার মধ্য দিয়ে পরিধি (রিমল্যান্ড) ব্যবহার করার চেষ্টা করে। তার নিকটতম মিত্র উত্তর কোরিয়া থেকে শুরু করে কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, পাকিস্তান এবং আরও ১১টি আফ্রিকান দেশ যেখানে চীন সমুদ্রবন্দর পরিচালনা করে এবং এসকল প্রকল্পে প্রচুর পরিমাণে সম্পদ বিনিয়োগ করেছে। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে বন্দর, বিমানবন্দর বা অন্যান্য অবকাঠামোর সরাসরি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করছে।

দৃশ্যত আফ্রো-ইউরেশিয়ায় এবং সেখান থেকে বাকি বিশ্বের মধ্যে একটি প্রভাব রাখার জন্য এশিয়ান এবং আফ্রিকান উপকূলরেখার মধ্য দিয়ে পরিধি (রিমল্যান্ড) ব্যবহার করার চেষ্টা করে। তার নিকটতম মিত্র উত্তর কোরিয়া থেকে শুরু করে কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, পাকিস্তান এবং আরও ১১টি আফ্রিকান দেশ যেখানে চীন সমুদ্রবন্দর পরিচালনা করে এবং এসকল প্রকল্পে প্রচুর পরিমাণে সম্পদ বিনিয়োগ করেছে। এই বিনিয়োগের মাধ্যমে বন্দর, বিমানবন্দর বা অন্যান্য অবকাঠামোর সরাসরি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শক্তিশালী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করছে।

ঋণ-ফাঁদ কূটনীতি

ঋণ-ফাঁদ কূটনীতি চীনাদের আরেকটি কৌশল। এই পদ্ধতিতে চীন তুলনামূলক দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য ঋণ দিয়ে থাকে এবং উন্নয়নের নামে ঋণ নিতে উৎসাহিতও করে দেশটি। আগের ঋণ শোধ না হলেও তারা কোনো কার্পণ্য করে না নতুন করে ঋণ দিতে। গরিব বা উন্নয়নশীল দেশগুলো অকাতরে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের ঋণ নিতে থাকে। চীন জানে যে, এই ‘গরিব’ দেশগুলো এই অর্থ ফেরত দিতে পারবে না। আর এটাই তাদের মূল লক্ষ্য। তৈরি হয় ঋণ-ফাঁদ এবং আদায় করে নেওয়া হয় বিভিন্ন সুবিধা, দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ ও অন্যায় দাবি! ‘ঋণ-ফাঁদ কূটনীতি’-কে চীন এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে যে, অনেক দেশই এখন তাদের কাছ থেকে যেকোনো ধরনের ঋণ নিতে ভয় পায়। বড়ো অঙ্কের বিনিয়োগের নামে চীনের ‘চেক বুক কূটনীতি’র খপ্পরে পড়ছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ। ফলে বাধ্য হয়ে চীনের হাতে তুলে দিচ্ছে ভূমি, বন্দর, বিমানবন্দর।

  • ঋণ-ফাঁদ কূটনীতিতে পড়ে তাজিকিস্তান বাধ্য হয় চীনের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ সীমান্তের দাবি ছেড়ে দিতে।
  • শ্রীলংকা হাম্বানটোটা সমুদ্রবন্দর নির্মাণের জন্য চীনের কাছ থেকে শর্ত ছাড়া ১ বিলিয়ন ডলার নিয়েছিল। এই বন্দর ভারত মহাসাগরে ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার বাণিজ্যপথের সংযোগকারী বন্দর হিসেবে কাজ করে। কিন্তু সমুদ্রবন্দরটি থেকে প্রত্যাশিত আয় না আসায় এবং বিশাল এই ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় শ্রীলংকা হাম্বানটোটা সমুদ্রবন্দর ৯৯ বছরের জন্য চীনের কাছে লিজ দিতে বাধ্য হয়।
  • একইভাবে তারা বিপুল ঋণে জর্জরিত জিবুতিকে শত শত কোটি ডলার ঋণ দিয়ে সেখানে তাদের প্রথম বিদেশি ঘাঁটি নির্মাণ করেছে। শুধু এখানেই নয়, তুর্কমেনিস্তান, আর্জেন্টিনা, নামিবিয়া ও লাওসে তারা একই কাজ করেছে।
  • ২০১৫ সালে চীন অস্ট্রেলিয়ার ডারউইন গভীর সমুদ্রবন্দর ৩৮ কোটি ৮০ লাখ ডলারে ৯৯ বছরের জন্য ইজারা নেয়, যেখানে সহস্রাধিক মার্কিন মেরিন সেনার অবস্থান।

চীন ভূমধ্যসাগরে ৪৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারে নগদ অর্থের ঘাটতিতে থাকা গ্রিসের কাছ থেকে পিরায়েয়ুস বন্দর কিনে নিয়েছে। চীনের বিনিয়োগের জালে ফেঁসেছে ইউরোপের সাত দেশ যথা আলবেনিয়া, বসনিয়া, বুলগেরিয়া, ক্রোয়েশিয়া, কসোভো, মেসিডোনিয়া ও মন্টিনিগ্রো। বলকান রাষ্ট্রগুলোর জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশই ব্যয় হচ্ছে এ ঋণ পরিশোধে। পরিস্থিতি এমন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, মন্টিনিগ্রো জনকল্যাণমূলক ব্যয় হ্রাস, সরকারি কর্মচারীদের বেতন কর্তন এবং সিগারেট, অ্যালকোহল ও কয়লার ওপর কর বাড়িয়ে দেয়।

চীনের উলফ ওয়ারিয়র কূটনীতি

যত দ্রুতই চীনের উত্থান হচ্ছে এবং অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে, ততই পশ্চিমা দেশগুলো বিশেষত শক্তিধর দেশগুলো চীনের এই উত্থানকে হুমকি হিসেবে দেখছে। এই দেশগুলো চীনের আবির্ভাবকে মেনে নিতে কেবলই যে প্রস্তুত নয় তা নয়, বরং আগ্রহীও নয়। আর তাই তারা চীনের নামের প্রোপাগান্ডা ছড়ায়। পশ্চিমা মিডিয়াগুলো বায়াস এবং তারা চীন-বিরোধী সংবাদ প্রকাশ করে বলে অধিকাংশ চীনা নাগরিক মনে করেন। ২০১৫ ও ২০১৭ সালে চীনা জাতীয়তাবাদের প্রেক্ষাপটে নির্মিত হয় দুটি চীনা চলচ্চিত্র উলফ ওয়ারিয়র ও উলফ ওয়ারিয়র ২। সিনেমার গল্পে দেখা যায় চীনের পিপলস রিপাবলিক আর্মির এজেন্ট চীনের বাইরের শত্রুদের বিরুদ্ধে রুদ্ধশ্বাস অপারেশন চালিয়ে চীন-বিরোধী কর্মকাণ্ড নস্যাৎ করে চীনের জাতীয় শক্তি বৃদ্ধি করছে। এই চলচ্চিত্র দুটি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে চীনা কর্তৃপক্ষ উলফ ওয়ারিয়র কূটনীতি গ্রহণ করেছে।

ঐতিহাসিকভাবে চীনের কূটনীতির যে চরিত্র, তা থেকে ‘উলফ ওয়ারিয়র ডিপ্লোমেসি’র চরিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। চীন এতদিন ধরে অন্য দেশের সাথে কূটনৈতিক সহাবস্থানে বিশ্বাসী ছিল, প্রতিপক্ষ কিংবা প্রতিবেশী দেশগুলোকে সমীহ করে আলোচনার টেবিলে আসত। চীনের বিরুদ্ধে মতাদর্শিক কারণে আগে থেকেই পশ্চিমা পুঁজিবাদী দেশগুলোর দ্বন্দ্ব ছিল ফলে তারা আগে থেকেই চীনের বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে আসছে। কিন্তু বর্তমানে যেখানে পরিবর্তন এসেছে তা হলো চীন আগে তার প্রতি তীর্যক ও আক্রমণাত্মক মন্তব্যগুলোতে যে নমনীয়তা প্রদর্শন করত, এখন ঠিক তার উল্টোটা করে। সাবেক চীনা প্রেসিডেন্ট দেং শিয়াওপিং একবার মন্তব্য করেছিলেন, “শত্রুকে কখনও নিজের সামর্থ্য দেখিও না, সময়ের অপেক্ষায় থাকো ও পর্যবেক্ষণ করো।” নিজেদের কূটনীতিতে এতদিন এই বাক্যেরই বাস্তবায়ন ঘটিয়ে আসছিল চীনারা।

মূলত তারা বিশ্ববাসীকে জানান দিতে চায়, চীন আর আগের মতো নমনীয় নয়, শত্রুর কাছে নিজের সক্ষমতা গোপন করে নয় বরং প্রকৃত সক্ষমতা জানান দিতেই তৎপর।

‘মেগাফোন কূটনীতি’ (megaphone diplomacy)

মেগাফোন কূটনীতি হলো এমন একটি কূটনৈতিক কৌশল, যেখানে কোনো রাষ্ট্র বা রাজনৈতিক নেতা গোপন আলোচনা বা কূটনৈতিক আলোচনার পরিবর্তে সরাসরি প্রচারমাধ্যম বা পাবলিক প্ল্যাটফর্মে তাদের বার্তা, দাবি বা অবস্থান তুলে ধরে অন্য রাষ্ট্র বা পক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এটি প্রচলিত কূটনৈতিক চর্চার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, যেখানে সাধারণত পর্দার আড়ালে আলোচনা করা হয়। বরং মেগাফোন কূটনীতি গণমাধ্যম, জনমত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়ে কূটনৈতিক বা রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগ করার একটি কৌশল।

‘মেগাফোন’ প্রকৃত অর্থে একটি যন্ত্র, যা মানুষের কণ্ঠস্বরকে উচ্চমাত্রায় বাড়িয়ে জনসমক্ষে পৌঁছে দেয়। এই ধারণা থেকে ‘মেগাফোন কূটনীতি’ শব্দটি এসেছে, যেখানে কোনো দেশ বা নেতা তাদের অবস্থান বা বক্তব্য সরাসরি গোপন কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে না করে জনসমক্ষে বা গণমাধ্যমের মাধ্যমে প্রকাশ করে।

এটি সাধারণত চাপ প্রয়োগ বা জনগণের মনোযোগ আকর্ষণ করার উদ্দেশ্যে করা হয়, যাতে সমঝোতার পরিবর্তে নিজেদের অবস্থান জোরালোভাবে তুলে ধরা যায়। এক্ষেত্রে কোনো রাষ্ট্র বা তার প্রতিনিধি গোপন বা আনুষ্ঠানিক আলোচনার পরিবর্তে প্রকাশ্যে গণমাধ্যমে বা জনসমক্ষে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে বক্তব্য দেয়। জনসমক্ষে বিবৃতি, বক্তব্য, বা সতর্কতা দেওয়া হয়। যখন কোনো দেশ অন্য একটি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সমস্যার সমাধান নিয়ে আলোচনা না করে, সেই সমস্যাগুলো মিডিয়ায় তুলে ধরে, তখন সেটি মেগাফোন কূটনীতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। জনসমক্ষে বিবৃতি, সংবাদ সম্মেলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা মিডিয়ায় সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে এ ধরনের কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়, যাতে তাদের সিদ্ধান্ত বা নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়।

উৎপত্তি: মেগাফোন কূটনীতির উৎপত্তি বিশ শতকের শুরুর দিকে ঘটে, যখন যোগাযোগের নতুন মাধ্যমগুলো, যেমন রেডিও, সংবাদপত্র এবং পরে টেলিভিশন, কূটনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে।

অলিম্পিক ডিপ্লোম্যাসি বা অলিম্পিক কূটনীতি

বিবদমান দুই দেশের বিভিন্ন ট্র্যাকের কূটনৈতিক পর্যালোচনা যখন বন্ধ থাকে তখন সেটি নিরসনের লক্ষ্যে বা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে মূলত অলিম্পিক গেমসে দুই দেশের অ্যাথলেটদের কে অংশগ্রহণের যে কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা যায় অলিম্পিক ডিপ্লোম্যাসি বা অলিম্পিক কূটনীতি বলা হয় যা অনেকটা পিং পং ডিপ্লোম্যাসি এর মত। এই কূটনৈতিক তৎপরতা যে সবসময় পজিটিভই হয় তা নয়; কখনো কখনো শত্রুতা ও প্রতিযোগিতাকে আরো তীব্রতরও করে। প্রাচীন গ্রিসে আদি অলিম্পিক ছিল সমাজের যাঁরা নি যন্ত্রক তাঁদের বিনোদনের উদ্দেশ্যে আয়োজিত নানা রকম প্রতিযোগিতা, যেখানে সরাসরি অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই ছিল ক্রীতদাস। ফলে রাজনৈতিক বিভাজন সেখানে ছিল অলিম্পিকের একটি আবশ্যকীয় উপাদান ১৮৯৬ সালে ব্যারন কুবার্ত কর্তৃক প্রবর্তিত আধুনিক অলিম্পিক যে রাজনৈতিক বিভাজন থেকে দূরে তা আশা করাই যায়।

৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ তে কোরীয় উপদ্বীপের যুদ্ধদেহী দুই কোরিয়ার মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় শীতকালীন অলিম্পিক গেমসিটি সেকেন্ড ট্র্যাক কূটনীতির মতো কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার পিয়ংচ্যাঙয়ে অনুষ্ঠিত শীতকালীন অলিম্পিকসে উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ায় অলিম্পিকস কূটনীতি সফলতার মুখ দেখে।

  • NEO-LIBERALISATIONOF THE GAMES
  • REPUTATIONPROMOTION
  • NATIONALISM
  • StateDiplomacy
  • OlympismasDiplomacy
  • OLYMPICDIPLOMACY ASCONTESTATION
  • SupportDiplomacy
  • Multi-stakeholderDiplomacy
  • OLYMPIC DIPLOMACY

পিয়ংচ্যাংয়ের অলিম্পিককে যুদ্ধদেহী দুই কোরিয়ার মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে কোরিয়ার পতাকার নিচে দুই দেশের ক্রীড়াবিদদের অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের কুচকাওয়াজে যোগ দেওয়া এবং নারীদের আইস হকি প্রতিযোগিতার জন্য সম্মিলিত একটি দল ঠিক করে নেওয়া। বিগত দিনগুলোর বাগাড়ম্বরপূর্ণ পদধ্বনির আলোকে সাম্প্রতিক এই উদ্যোগকে রীতিমতো বৈপ্লবিক আখ্যায়িত করা যায়। অলিম্পিক-পরবর্তী সময়ে এই ঐক্যবদ্ধতা বা শান্তির ঐক্যতার বিস্তৃত হতে থাকে; কেননা, এর পরই ২৭ এপ্রিল ২০০৮ সীমান্তবর্তী গ্রাম পানমুনজামে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে ইন দীর্ঘ ৬৮ বছর পর যে শান্তি প্রস্তাবে যে একমত হয়েছেন তা পরোক্ষভাবে অলিম্পিক ডিপ্লোম্যাসিরই বাইপ্রোডাক্ট বললেও ভুল হবে না। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায় কোরীয় উপদ্বীপে অলিম্পিক ডিপ্লোম্যাসি সফলতার মুখ দেখেছে।

Pilot Fish Behaviour কী?

পাইলট মাছ (Pilot Fish – Naucrates ductor) হলো একটি সামুদ্রিক মাছ, যা সাধারণত হাঙর, রশ্মি (Rays), কচ্ছপ বা বড় জাহাজের সাথে সাঁতার কাটে। এই মাছের আচরণ সহজীবী সম্পর্ক (Symbiotic Relationship)-এর একটি ক্লাসিক উদাহরণ।

Pilot Fish Behaviour: আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে বৃহৎ এবং শক্তিশালী প্রতিবেশী রাষ্ট্রের উপস্থিতিতে ক্ষুদ্র ও দুর্বল প্রতিবেশী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছেন। এক্ষেত্রে দুইটি তত্ত্ব আছে। যার একটি হলো পাইলট ফিস আচরণ। এই তত্ত্বের উপস্থাপক এরলিং বিজল। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো পার্শ্ববর্তী বৃহৎ ও শক্তিশালী রাষ্ট্রের সাথে বিবাদে না গিয়ে তার অবস্থানকে স্বীকার করে নিয়ে সুকৌশলে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এক্ষেত্রে তিনি রূপক হিসেবে পাইলট নামের ছোট ছোট মাছের আচরণের কথা বলেছেন যা হাঙরের গা ঘেঁষে চলে বা এমনভাবে লেগে লেপ্টে থাকে যাতে হাঙর তাকে খেয়ে ফেলতে না পারে এবং এভাবেই এরা জীবন বাঁচায়। এ তত্ত্বের সার্থক প্রয়োগকারী হচ্ছে ফিনল্যান্ড। প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নে খাবার মুখে থেকে তার সাথে ভালো সম্পর্ক রেখে ফিনল্যান্ড তার স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা টিকিয়ে রেখেছিল। এর বিপরীতের তত্ত্বটি হচ্ছে বড় দেশকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বৃহৎ শক্তির আগ্রাসী মনোভাব দুর্বল করে দেওয়া। এক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো কিউবা। কিউবা ৫৭ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কব্জা থেকে নিজের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে টিকে আছে। বাংলাদেশ-ভারতে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাস্তব নীতি গ্রহণের ক্ষেত্রে এ তত্ত্ব প্রয়োগের কথাও কেউ কেউ বলেছেন। বলা বাহুল্য এ ধরনের তত্ত্ব প্রয়োগের বেলায় দুটো দেশকেই বিবেচনায় রাখতে হয়। অবশ্য তত্ত্বটির প্রয়োগ বহুপাক্ষিকভাবে ও হতে পারে। এক্ষেত্রে দুর্বল রাষ্ট্রটি এমনভাবে শক্তি অর্জনের চেষ্টা করে যাতে শক্তিশালী রাষ্ট্রটি তাকে গ্রাস করতে না পারে। অনেকে আন্তর্জাতিক সংস্থা সমূহ ও অন্যান্য শক্তির সাথে বাংলাদেশের সক্রিয় সম্পৃক্ততাকে তার নিজস্ব শক্তি বৃদ্ধির প্রয়াস হিসেবে চিহ্নিত করে।

গ্রে জোন কূটনীতি (Gray Zone Diplomacy) কী?

গ্রে জোন কৌশল হলো আন্তর্জাতিক সংঘাত বা প্রতিযোগিতার এমন একটি ক্ষেত্র, যা শান্তি ও সরাসরি যুদ্ধের মধ্যবর্তী অবস্থায় বিদ্যমান। এই কৌশলগুলোর উদ্দেশ্য হলো প্রতিপক্ষের উপর চাপ সৃষ্টি করে নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করা, কিন্তু এমনভাবে যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণার সীমা (Threshold of War) অতিক্রম না করে।

মূল বৈশিষ্ট্য ও কৌশল:

  • অস্পষ্টতা (Ambiguity): কৌশলগুলো এমনভাবে সাজানো হয় যাতে এগুলোকে সহজে যুদ্ধের কাজ হিসেবে চিহ্নিত করা না যায়। এর ফলে আক্রান্ত রাষ্ট্র তাৎক্ষণিক ও সামরিক জবাব দিতে দ্বিধাবোধ করে।
  • সীমার নিচে থাকা (Below the Threshold of War): এই কার্যকলাপগুলি এমনভাবে পরিমাপ করা হয় যাতে তা জাতিসংঘ সনদের (UN Charter) অধীনে সামরিক পদক্ষেপের বৈধ কারণ না হয়ে দাঁড়ায়।
  • ক্রমাগত চাপ (Incremental Coercion): উদ্দেশ্য হলো সীমিত, ধীর ও ধারাবাহিক চাপের মাধ্যমে প্রতিপক্ষের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন বা সুবিধা আদায় করা।

উদাহরণ: চীন তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ মনে করে এবং সরাসরি সামরিক আগ্রাসন এড়িয়ে গ্রে জোন কৌশল ব্যবহার করে তার লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করে। এই কৌশলগুলোর লক্ষ্য হলো তাইওয়ানের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে হস্তক্ষেপ করতে নিরুৎসাহিত করা।

Coup D’ etat (অভ্যুত্থান):

Coup D’ etat বা Coup দ্বারা অভ্যুত্থান বোঝায়। শব্দটি ফরাসি ভাষা থেকে এসেছে। একটি ছোট গোষ্ঠী দ্বারা বিদ্যমান সরকারকে হঠাৎ করে সহিংসভাবে উৎখাত করাকেই অভ্যুত্থান বলে। একটি অভ্যুত্থানের প্রধান শর্ত হলো সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ এবং অন্যান্য সামরিক উপাদানগুলির সমস্ত বা অংশের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। আধুনিক অভ্যুত্থানগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল নেপোলিয়ন কর্তৃক ৯ নভেম্বর, ১৭৯৯ (১৮ ব্রুমায়ার) তৎকালীন শাসনকে উৎখাত করা। সাধারণত কোনো দেশের সামরিক বাহিনীর নেতৃত্বই এধরনের অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়ে থাকেন।

Thucydides Trap

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গ্রাহাম অ্যালিসন “থুসিডাইডস ট্র্যাপ” সম্পর্কে প্রথম আলোচনা করেন। থুসিডাইডস ট্র্যাপ বলতে একটি ক্রমবর্ধমান শক্তি এবং একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তির মধ্যে সংঘর্ষ এবং যুদ্ধের সম্ভাবনাকে বোঝায়। নামটি এসেছে প্রাচীন গ্রিক ঐতিহাসিক থুসিডাইডস থেকে, যিনি খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতাব্দীতে স্পার্টা (একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তি) এবং এথেন্সের (একটি ক্রমবর্ধমান শক্তি) মধ্যে একটি দ্বন্দ্বের ফলে সৃষ্ট পেলোপোনেশিয়ান যুদ্ধকে বর্ণনা করেছেন। যখন একটি ক্রমবর্ধমান শক্তি একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তির আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে, তখন উত্তেজনা এবং সংঘর্ষের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। প্রতিষ্ঠিত শক্তি ক্রমবর্ধমান শক্তিকে তার অবস্থানের জন্য একটি হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে এবং এই শক্তিকে বিভিন্নভাবে প্রতিহত করতে চেষ্টা করে। এই প্রতিযোগিতা এবং ক্ষমতা হারানোর ভয় সামরিক সংঘাতে পরিণত হতে পারে, সম্ভাব্য যুদ্ধের দিকে নিয়ে যেতে পারে।

উদাহরণ: থুসিডাইডস ট্র্যাপের একটি আধুনিক উদাহরণ হলো চীনের ক্রমবর্ধমান শক্তি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত শক্তির মধ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা। গত কয়েক দশক ধরে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধি পাওয়ায় এটি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এবং বৈশ্বিক মঞ্চে তার প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছে যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রত্যাবাসন (Repatriation)

প্রত্যাবাসন হলো ব্যক্তি, সম্পদ, বা তহবিল তাদের নিজ দেশে বা উৎপত্তিস্থলে ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া। প্রত্যাবাসন হলো এমন একটি চুক্তি যার মাধ্যমে আশ্রয় প্রদানকারী দেশ থেকে আশ্রিত জনগণ বা শরণার্থীদের স্বেচ্ছায় তার নিজ দেশে ফেরত দেওয়া হয়।

উদাহরণ: বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত ৩০ দফা ‘ফিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট’ নামে একটি চুক্তি সই হয়। রোহিঙ্গারা বলছে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলে, বাড়িঘর পুনর্নির্মাণ হলে এবং নিপীড়ন বন্ধ হলেই তারা মিয়ানমারে ফিরবে। তবে তেমন অবস্থা এখনো তৈরি হয়নি বলে প্রত্যাবাসন সফল হয়নি।

প্রত্যাবাসনের শর্ত:

প্রত্যাবাসন বৈধ এবং স্বেচ্ছাসেবী ভিত্তিতে যেন সম্পাদিত হয় তার দায়িত্ব UNHCR-কে নিশ্চিত করতে হবে। ১৯৫০ সালের General Assembly Resolution 428 (V) অনুযায়ী স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের শর্তসমূহ নিম্নরূপ:

১। প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছায়, নিরাপদ এবং এটি মর্যাদার সাথে সম্পন্ন হতে হবে।

৩। স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের জন্য UNHCR সরকার ও এনজিওগুলো পরিবেশ সৃষ্টিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

৪। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সরকারকে স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনের জন্য প্রত্যাবাসনকারীদের সাহায্য করবে।

৫। প্রত্যাবাসনকারীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

Sent back: অ-স্বেচ্ছামূলক (Involuntary) বা জোরপূর্বক। এটি একটি একতরফা সিদ্ধান্ত, যেখানে আশ্রয়দাতা রাষ্ট্র বলপূর্বক বা আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিকে ফেরত পাঠায়।

সবচেয়ে বড় পার্থক্য হলো:

  1. ১Repatriation = স্বেচ্ছায় ফেরা + নিরাপত্তার নিশ্চয়তা (Voluntary Return + Guarantee of Safety).
  2. ২Sent Back = জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো + প্রায়শই আইনি বা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত (Forced/Administrative Removal).

‘নন-রিফাউলমেন্ট’ নীতি (Principle of Non-refoulement): আন্তর্জাতিক আইনে এই নীতির অধীনে কোনো রাষ্ট্র এমন কোনো ব্যক্তিকে ফেরত পাঠাতে পারে না, যার জীবন বা স্বাধীনতা নিজ দেশে জাতি, ধর্ম, জাতীয়তা, বিশেষ সামাজিক গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক মতামতের কারণে হুমকির মুখে পড়তে পারে। ‘Sent Back’ প্রক্রিয়াটি এই নীতির লঙ্ঘন ঘটাতে পারে, যেখানে ‘Repatriation’ এই নীতি মেনেই করা হয়।

Extradition (বহিঃসমর্পণ/অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি)

বহিঃসমর্পণ চুক্তি হলো এক দেশের অপরাধীকে চুক্তির মাধ্যমে তার নিজ দেশে ফেরত পাঠানো। প্রত্যর্পণ হলো একটি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া যা একজন ব্যক্তিকে অনুরোধকারী দেশের এখতিয়ারে সংঘটিত অপরাধের বিচার বা শাস্তির জন্য অন্য রাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ করে। এটি সাধারণত একটি দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক চুক্তি দ্বারা সম্পন্ন হয়। কিছু দেশ চুক্তি ছাড়াই প্রত্যর্পণ করে, কিন্তু এই ঘটনাগুলি বিরল। প্রত্যর্পণ চুক্তি সরকারকে তাদের দেশ থেকে পালিয়ে আসা অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে সহায়তা করে। বহিঃসমর্পণ সংক্রান্ত নীতির ওপর ১৯৩৩ সালে Montevideo Treaty স্বাক্ষরিত হয়। বহিঃসমর্পণ সংক্রান্ত নীতির ও পর ১৯৩৩ সালে স্বাক্ষরিত হয়।

এখন পর্যন্ত ভারতের সঙ্গে বহিঃসমর্পণ ও বন্দি হস্তান্তর এবং থাইল্যান্ডের সঙ্গে বহিঃসমর্পণ চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ। এই চুক্তির আওতায় দুই দেশের অপরাধীদের দুটো দেশ পরস্পরের কাছে হস্তান্তর করবে। উদাহরণ: বহিঃসমর্পণ চুক্তির আওতায় নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনকে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা হয়। আবার উলফা নেতা অনুপ চেটিয়াকে ভারতে ফেরত দেওয়া হয়।

দ্বৈত অপরাধের নীতি:

দ্বৈত অপরাধের নীতি বলতে বোঝায় যে, যে অপরাধের জন্য বহিঃসমর্পণ করা হবে তা সমর্পণকারী দেশ ও তা অনুরোধ করা দেশ উভয় দেশেই অপরাধ বলে গণ্য হতে হবে। অন্যথায় এই অপরাধ বহিঃসমর্পণযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য হবে না।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাহায্য লাগবে?
BCS Journey Support
● Online
×
💬Messenger ✈Telegram
BCS JOURNEY
BCS Journey
চ্যাট শুরু করুন ➜