● বিসিএস লিখিত: আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি

জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের উপর প্রধান প্রভাব ও অভিঘাত | বিসিএস লিখিত

📌 এক নজরে

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশে তিন ধরনের—ভৌত, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক ও পরিবেশগত—যা একে অপরের সাথে অন্তঃসংযুক্ত। এটি ৪৬তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় এসেছে। এই পোস্টে প্রতিটি ধরনের প্রভাব আলাদা শিরোনামে পাবেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের প্রভাব (Impacts) পড়েছে যার মধ্যে প্রধান হলো ভৌত (Physical), অর্থনৈতিক (Economic) এবং সামাজিক ও পরিবেশগত (Social and Environmental)। এই প্রভাবগুলো একে অপরের সাথে অন্তঃসংযুক্ত এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রের প্রভাবগুলি গভীর এবং সুদূরপ্রসারী, যা শুধুমাত্র বর্তমান প্রজন্ম নয়, ভবিষ্যতের জন্যও এক বিশাল ঝুঁকি তৈরি করছে। নিচে প্রতিটি ক্ষেত্রের ওপর বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

ভৌত প্রভাব (Physical Impact)

  • বায়ুমণ্ডলের উচ্চতা বৃদ্ধি: প্রচুর পরিমাণে CO2 গ্যাস নির্গমনের ফলে বায়ুমণ্ডলের তাপ CO2 ফাঁদে আটকে পড়ে। ফলে ২১ শতকে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে দৈনিক গড় তাপমাত্রা সমানুপাতিক হারে বেড়ে চলবে। আগামী ২০৩০-২০৫০ সালের মধ্যে দৈনিক গড় তাপমাত্রা ২০-৫০ ডিগ্রি সে. পর্যন্ত পৌঁছাবে।
  • লোনা পানির অনুপ্রবেশ ও কৃষি উৎপাদন হ্রাস: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি হেতু উপকূলবর্তী কৃষি জমিতে লোনা পানির অনুপ্রবেশ ঘটাবে। এতে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হবে। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। IPCC- এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ধানের জমি ১০ শতাংশ এবং গমের জমি ৩০ শতাংশ বিনষ্ট হবে।
  • অস্বাভাবিক তাপমাত্রা: বাংলাদেশ নাতিশীতোষ্ণ আবহাওয়ার দেশ। কিন্তু জলবায়ুর বৈরিতার কারণে দেশের সর্বোচ্চ গড় তাপমাত্রা বেড়েই চলেছে। আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায় গত ৫০ বছরে দেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি হার দাঁড়িয়েছে ০.৫ ডিগ্রি সে.। এমনকি ২০৫০ সাল নাগাদ বাংলাদেশের তাপমাত্রা গড়ে ১.৪০ ডিগ্রি সে. এবং ২১০০ সাল নাগাদ ২.৪০ ডিগ্রি সে. বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
  • সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধি: সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের প্রায় ৮ শতাংশেরও বেশি নিম্নাঞ্চল ও প্লাবনভূমি আংশিক অথবা স্থায়ীভাবে জলমগ্ন হয়ে পড়বে। বিশ্বব্যাংক-র দেয়া তথ্যমতে, বিংশ শতাব্দীতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১০-২০ সেন্টিমিটার বেড়েছে। IPCC এর তথ্যমতে, ২০৫০ সালে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের অন্তত ১৭ হাজার বর্গ কিলোমিটার ভূমি সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যাবে। বিশ্বব্যাংক প্রকাশিত তালিকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ঝুঁকিপূর্ণ ১২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম।

  • Global warming

  • Increase conflict overnatural resources
  • Food shortage
  • Shortage of drinkingwater
  • Sea level riseand floods
  • Diseaseoutbreak
  • Health hazards
  • Wildfires
  • Migration
  • Frequent and extremeweather events
  • Droughts
  • Hunger

  • বৃষ্টিপাত হ্রাস: বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে ধানের ফুল আসার সময় থেকে বীজ বের হওয়ার মাঝখানের সময়টুকুতে প্রয়োজনের তুলনায় বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় টি-আমন জাতের ধানের উৎপাদন কমে আসছে। এমনকি ভরা বর্ষায় জয়পুরহাটের কালাই উপজেলায় অনাবৃষ্টিতে আমন ধানের বিশাল খেত রোদে পুড়েছে (২০১০ সালে)। যেখানে আমন

ধান রোপনের অন্তত ৩ সপ্তাহ পর্যন্ত পানি ধরে রাখা নিশ্চিত করতে হয়, না হলে কুশি বাড়ে না; সেখানে পানির অভাবে জমিতে ফাটল দেখা দিয়েছে।

  • *লবণাক্ততা বৃদ্ধি:* বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নদ-নদীর পানিপ্রবাহ শুকনো মৌসুমে স্বাভাবিক মাত্রায় থাকে না। ফলে নদীর পানির বিপুল চাপের কারণে সমুদ্রের লোনাপানি যতটুকু এলাকা জুড়ে আটকে থাকার কথা ততটুকু থাকে না, পানির প্রবাহ কম থাকার কারণে সমুদ্রের লোনাপানি স্থলভাগের কাছাকাছি চলে আসে। ফলে লবণাক্ততা বেড়ে যায় দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের বিপুল এলাকায়। বরিশাল ও পটুয়াখালীতে লবণাক্ততার পরিমাণ ২ পিপিটি (লবণাক্ততা পরিমাপক মাত্রা) থেকে বেড়ে ৭ পিপিটি হয়ে গেছে। চট্টগ্রাম শহরের সন্নিকটে হালদা নদীর পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেড়ে ৮ পিপিটি হয়ে গেছে।
  • *প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি:* জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে বৃদ্ধি পেয়েছে নানা রকম প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তন্মধ্যে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, নদীভাঙন এবং ভূমিধ্বসের মাত্রাবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্য। আগে ১৫ কিংবা ২০ বছর পরপর বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও বর্তমানে ২ থেকে ৩ বছর পরপরই বড় ধরনের দুর্যোগ হানা দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা German Watch -এর প্রতিবেদন- ২০২২ অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০১৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশে বড় ধরনের প্রায় ২৫৮টি দুর্যোগ আঘাত হেনেছে।

অর্থনৈতিক প্রভাব (Economic Impacts)

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। দেশের প্রধান অর্থনৈতিক খাতগুলো, বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য ও অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচের প্রতিবেদন (২০১৭) অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সার্বিকভাবে বাংলাদেশের বাৎসরিক আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ২.৩১ ট্রিলিয়ন ডলার যা জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে ১.৮১% নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

  • *কৃষি উৎপাদন হ্রাস:* বন্যা, খরা এবং লবণাক্ততার কারণে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণা অনুযায়ী, লবণাক্ততার কারণে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১ মিলিয়ন হেক্টর জমির ধান উৎপাদন প্রায় ২০% হ্রাস পেয়েছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
  • *মৎস্য ও বনজ সম্পদ ধ্বংস:* বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে মেরু অঞ্চলে বরফ গলতে থাকবে। এতে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে, পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাবে, উপকূলীয় অঞ্চল প্লাবিত হবে। ফলে উপকূলীয় বনাঞ্চল সামুদ্রিক মাছ কমে যাবে। সমুদ্রের তাপমাত্রা যখন ৩২০ ডিগ্রি সে. এর বেশি হয়, তখন অনেক মাছ বেঁচে থাকতে পারে না।
  • *অবকাঠামো ধ্বংস:* প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে প্রতি বছর রাস্তাঘাট, ব্রিজ, বাঁধ এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। Global Climate Risk Index 2020 অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ সপ্তম স্থানে রয়েছে, যা অবকাঠামো পুনর্গঠনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে বাধ্য করে।
  • *শিল্প ও পর্যটন খাতে ক্ষতি:* জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগে শিল্প কারখানা ও পর্যটন কেন্দ্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, সুন্দরবনের মতো প্রাকৃতিক পর্যটন কেন্দ্রগুলো ঘূর্ণিঝড় ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে হুমকির মুখে।
  • *অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত জনসংখ্যা ও শরণার্থী বৃদ্ধি:* সারাবিশ্বে বিরূপ জলবায়ুর কারণে অসংখ্য মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। শরণার্থী প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে ২০২২ সালে ৭ কোটি ১০ লাখেরও বেশি মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। যা আগের বছরের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি।
  • *খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকি:* কৃষি উৎপাদন হ্রাস পাওয়ার কারণে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর ফলে খাদ্যদ্রব্যের দাম বেড়ে যায়, যা নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং দারিদ্রের হার বাড়িয়ে তোলে।

সামাজিক ও পরিবেশগত প্রভাব (Social and Environmental Impacts)

জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতগুলো বাংলাদেশের সমাজ ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে, যা মানুষের জীবনযাত্রার মান, স্বাস্থ্য এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।

  • স্বাস্থ্যঝুঁকিতে মানুষ: জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে নানা রকম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। শ্বাসকষ্ট, হিটস্ট্রোক বা গরমজনিত মৃত্যু কিংবা তীব্র ঠান্ডাজনিত মৃত্যু ইত্যাদি এখন খুব সাধারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বখ্যাত স্বাস্থ্য সাময়িকী ল্যানসেট, বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য-প্রভাব নিয়ে করা তাদের গবেষণা রিপোর্টে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যেসব রোগের প্রকোপ দেখা দিতে পারে, সে সম্বন্ধে উল্লেখ করেছে: সংক্রমণ ও কীটপতঙ্গবাহিত রোগের ধরনে পরিবর্তন আসবে; তাপপ্রবাহে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে; জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়, কালবৈশাখী ইত্যাদিতে আক্রান্ত হয়ে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যাও বাড়বে।
  • পানীয় জলের সংকট: উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় সুপেয় জলের মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার মানুষ দূষিত পানি পান করতে বাধ্য হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
  • জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনসহ বিভিন্ন বনাঞ্চলের জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে। IPCC-এর এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা ১.৫°C বৃদ্ধি পেলে সুন্দরবনের প্রায় ৮০% ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস হতে পারে, যা রয়েল বেঙ্গল টাইগারের মতো বিপন্ন প্রজাতির আবাসস্থলকে হুমকির মুখে ফেলবে।
  • নারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ: জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নারীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। যেমন, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে সুপেয় জল সংগ্রহ করতে নারীদের অনেক দূর পর্যন্ত হেঁটে যেতে হয়, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে।
  • শিক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব: বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে। বিশেষ করে উপকূলীয় এবং নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় এই সমস্যা প্রকট।
  • পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা: জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশের বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। মিঠা পানির জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের পরিবেশ এবং মানুষের জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাহায্য লাগবে?
BCS Journey Support
● Online
×
💬Messenger ✈Telegram
BCS JOURNEY
BCS Journey
চ্যাট শুরু করুন ➜