● বিসিএস লিখিত: আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি

জাতিসংঘ শান্তি মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব | বিসিএস লিখিত

📌 এক নজরে

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন বাংলাদেশকে বলেছিলেন ‘জাতিসংঘের এক মডেল সদস্য’। শান্তিরক্ষা মিশন সেই পরিচয়ের বড় ভিত্তি। এই পোস্টে মিশনে বাংলাদেশের ভূমিকা এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে এর গুরুত্ব সংক্ষেপে সাজানো আছে।

উত্তর: “বাংলাদেশ জাতিসংঘের এক মডেল সদস্য” – জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো জ্বলছে। দেশের লাল-সবুজ পতাকা অশান্ত দেশগুলোর মানুষের কাছে পরিচিত হয়েছে ‘বাংলা বন্ধু’ দেশের পতাকা হিসাবে। অশান্ত দেশগুলোতে শান্তি ফেরাতে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা মিশনে সাফল্যের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাদের সাফল্যের কারণে বাংলাদেশের সম্মান দিন দিন বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে, বাংলাদেশ শান্তি রক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসাবে তিন নম্বর স্থানে উঠে এসেছে। বিভিন্ন মিশনে তারা রাস্তা-ঘাটসহ অবকাঠামো নির্মাণ কাজ করে যাচ্ছে। দক্ষিণ সুদানে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের তৈরি একটি রাস্তার নামকরণ করা হয়েছে ‘বাংলাদেশ রোড’। অন্যদিকে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের দিক থেকেও দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছেন।

বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার মহান ব্রত নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতিসংঘ। পর-পর দুটি বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা মানবসমাজকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে অনুপ্রাণিত করে। এই অনুপ্রেরণা থেকেই উদ্ভব হয় জাতিসংঘের।

দেশ মোট মিশন বাংলাদেশের অংশগ্রহণ চলমান
৪৩টি ৭১টি ৬৩টি ১৩টি

জাতিসংঘের ৬টি মূল অঙ্গসংস্থা এবং অনেকগুলো সহযোগী সংস্থা বিশ্বশান্তি, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। বেরিতার অবসান ঘটিয়ে যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশে শান্তি স্থাপনের জন্য কাজ করে যাচ্ছে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘের এই কার্যক্রমের এক গর্বিত অংশীদার।

শান্তিরক্ষী মিশন

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশন: বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষা করা জাতিসংঘের প্রধান কাজ। এক দেশের সাথে অন্য দেশের বিরোধ নিরসন ও মধ্যস্থতায় জাতিসংঘ নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করে থাকে। কিন্তু, অনেক দেশের অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং জাতিগত দাঙ্গা মোকাবিলায় এরূপ পদ্ধতি পুরোপুরি কার্যকরী নয়। সেখানে নিরাপত্তার প্রশ্নে সামরিক শক্তি প্রয়োজন। এই প্রয়োজনীয়তা থেকেই জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশন গঠিত হয়েছে।

মিশনের পরিচিতি: জাতিসংঘের নিজস্ব কোনো বাহিনী নেই। সদস্য দেশগুলোর প্রেরিত সামরিক সদস্যরাই এর প্রধান শক্তি। নিরাপত্তা পরিষদের তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন দেশের সামরিক, বেসামরিক ও আধা-সামরিক লোকজন নিয়ে এই বাহিনী গঠিত হয়। ১৯৪৮ সালে মধ্যপ্রাচ্য সংকটকে (ইসরাইল-ফিলিস্তিনি) কেন্দ্র করে প্রথম শান্তিরক্ষী বাহিনী গঠন করা হয়। এর পর থেকে যেখানে প্রয়োজন হয়েছে সেখানেই জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী প্রেরণ করেছে। অভাবক্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর নিকট ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষকে সহায়তা করা এবং যুদ্ধ-বিধ্বস্ত বিভিন্ন দেশের পুনর্গঠনে শান্তিরক্ষী বাহিনী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, জাতিসংঘ এ পর্যন্ত ৭১টি মিশন পরিচালনা করেছে এবং এর মধ্যে চলমান আছে ১৩টি মিশন। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনী ১৯৮৮ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করে।

শান্তিরক্ষী মিশনের কাজ: জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশন যে কাজ করে তার মধ্যে প্রধান হলো বিরোধপূর্ণ অঞ্চলে উত্তেজনা প্রশমন, যুদ্ধবিরতি চুক্তি তদারকি ও কার্যকর করা, স্থিতাবস্থা বজায় রাখা ও গণতান্ত্রিক পন্থায় নির্বাচন পরিচালনা করা, বিবাদমান গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সমঝোতা ও চুক্তি স্বাক্ষরে রাজি করানো, ভূমি মাইন অপসারণ করা, যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশের অবকাঠামো পুনর্গঠনে সহায়তা করা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, শরণার্থী ও উদ্বাস্তুদের মানবিক সাহায্য প্রদান ইত্যাদি।

শান্তিরক্ষা মিশন ও বাংলাদেশ

শান্তিরক্ষা মিশন ও বাংলাদেশ: জাতিসংঘের বিশ্বশান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশ বরাবরই সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। শান্তিরক্ষা মিশনে জাতিসংঘের আহ্বানে বাংলাদেশ প্রথম অংশগ্রহণ করে ১৯৮৮ সালের ইরান-ইরাক যুদ্ধে। সে যুদ্ধে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল প্রশংসাযোগ্য। এর পর দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে (২০১৩ সাল পর্যন্ত) বাংলাদেশের বিভিন্ন বাহিনী যেমন— সেনা, নৌ, বিমান, পুলিশ প্রভৃতি কৃতিত্বের সাথে এই মহতী দায়িত্ব পালন করে আসছে। বাংলাদেশি এসব বাহিনী দৃঢ় মনোবল, উন্নত শৃঙ্খলা, কঠোর পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে দায়িত্ব পালন করে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বর্তমানে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের ১৩টি মিশনের মধ্যে ৯টিতে বাংলাদেশের মোট ৫,৯৬১ জন শান্তিরক্ষী কাজ করছে। সব মিলে ৬৩টি মিশনে বাংলাদেশের বিভিন্ন বাহিনী অংশগ্রহণ করেছে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সর্বোচ্চসংখ্যক শান্তিরক্ষী পাঠানো ১১৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ দীর্ঘ সময় ধরে মর্যাদাপূর্ণ স্থান অক্ষুণ্ণ রেখে আসছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশ ২০২০ সালের জুলাই মাস থেকে গত বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত প্রথম স্থানে ছিল। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে নেপাল ৫৯৫১ জন পাঠিয়ে শীর্ষে রয়েছে। বাংলাদেশ ৫,৬৭৭ জনের মাধ্যমে রয়েছে তৃতীয়।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বিভিন্ন দেশের অবস্থান

১ম নেপাল ৬,১২৪ জন
২য় ভারত ৬,০৬৩ জন
৩য় বাংলাদেশ ৫,৯৬১ জন

স্থানে। দীর্ঘ সময় ধরে প্রথম বা দ্বিতীয় স্থানে থাকার রেকর্ড বাংলাদেশের রয়েছে। ‘নীল হেলমেট’ পরে বিশ্বশান্তির মঞ্চে বাংলাদেশের পথচলা শুরু ১৯৮৮ সালে। তখন জাতিসংঘের ইরান-ইরাক সামরিক পর্যবেক্ষক মিশনে ১৫ জন সদস্য পাঠিয়েছিল বাংলাদেশ। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে ১০ দেশে শান্তির পতাকা হাতে নিয়োজিত আছেন ৪৪৪ নারীসহ ৫ হাজার ৮১৮ শান্তিরক্ষী [আপডেট: মে, ২০২৫]। বিশ্বশান্তি রক্ষার এ যাত্রায় ৩৫ বছরে জীবন দিয়েছেন ১৬৮ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী। আহত হয়েছেন অন্তত ২৫৭ জন। পেশাদারত্বের মাধ্যমে শান্তি রক্ষা মিশনে সৈন্য প্রেরণকারী শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বাংলাদেশ তৃতীয় শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী নানা জাতি-গোষ্ঠী থেকে আসা। ভিন্ন সংস্কৃতি আর ভাষার এসব শান্তিরক্ষীর একমাত্র লক্ষ্য থাকে ঝুঁকিপূর্ণ মানবগোষ্ঠীকে রক্ষা করা। সহিংসতা থেকে শান্তির পথে আসা দেশগুলোকে সহযোগিতা করা। জাতিসংঘের শান্তি মিশনে বাংলাদেশ অন্যতম বৃহৎ শান্তিরক্ষী জোগানদাতা দেশ।

সেনাবাহিনীর ভূমিকা

বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ভূমিকা: জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের বিভিন্ন বাহিনী অংশগ্রহণ করলেও সেনাবাহিনীর ভূমিকাই প্রধান। বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর মূলমন্ত্র হলো ‘শান্তিতে আমরা, সমরে আমরা, সর্বত্র আমরা দেশের তরে’। কিন্তু আন্তর্জাতিক মিশনে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর অবদান দেখলে মনে হয় সারা বিশ্বের সব দেশই যেন বাঙালি সেনাবাহিনীর নিজ দেশ। সকল দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষাই যেন তাদের কাজ। আর তাইতো বাংলাদেশ বর্তমানে শান্তিরক্ষী বাহিনীতে সর্বোচ্চ সংখ্যক সেনা প্রেরণকারী দেশ।

জাতিসংঘের বিভিন্ন কার্যক্রমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমসমূহের বর্ণনা নিচে দেওয়া হলো:

বছরে আয় ৩ হাজার কোটি টাকা
আয়ের খাত ৩য় বৃহত্তম
  • নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ
  • সামরিক পর্যবেক্ষণ
  • মাইন উদ্ধার
  • আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা
  • নির্বাচন পরিচালনায় সহায়তা করা
  • মানবিক সহায়তা প্রদান
  • অবকাঠামো উন্নয়ন

স্বীকৃতি ও প্রশংসা

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদানের স্বীকৃতি: জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অনেক সদস্য গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হয়েছে।

  • জাতিসংঘের মহাসচিব বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন।
  • কৃতজ্ঞতাস্বরূপ সিয়েরা লিওন বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দিয়েছে, লাইবেরিয়া একটি সড়কের নাম রেখেছে বাংলাদেশ স্ট্রিট। এর থেকেও বড় স্বীকৃতি ও প্রাপ্তি হলো যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশসমূহের সাধারণ মানুষের মুখে ফুটিয়ে তোলা হাসি ও তাদের ভালোবাসা।
  • ২০১৪ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী Thank A Peace Keeper পুরস্কার লাভ করে (UN কর্তৃক)।
  • ২০২১ সালে বাংলাদেশের ৮জন শান্তিরক্ষী জাতিসংঘের কাছ থেকে দ্যাগ হ্যামারশোল্ড পদক লাভ করে।

বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশন যে অবদান রেখে চলছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এই কার্যক্রমে বাংলাদেশের বিভিন্ন বাহিনীর ভূমিকা এবং সাফল্য আমাদেরকে গর্বিত করেছে। এর মধ্যে আবার বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ভূমিকাই মুখ্য। এ পর্যন্ত শতাধিক বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীর মৃত্যু হয়েছে। তারপরও বাঙালিদের শৃঙ্খলাবোধ, পেশাদারিত্ব এবং দক্ষতা স্থানীয় জনগণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। এটি দেশ ও জাতির নিকট অত্যন্ত গৌরবের বিষয় বলে বিবেচিত।

“মানবাধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি গোলযোগপূর্ণ অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের সেনাদের ভূমিকা আমাকে মুগ্ধ করেছে। বাংলাদেশের মহিলা পুলিশ দল সোচ্চার রয়েছেন সামাজিক সম্প্রীতি সুসংহত করতে। আমি কোনো মিশনে গেলেই উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের সেনাদের কথা বলি।”

-শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টনিও গুতেরেজ

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাহায্য লাগবে?
BCS Journey Support
● Online
×
💬Messenger ✈Telegram
BCS JOURNEY
BCS Journey
চ্যাট শুরু করুন ➜