● বিসিএস লিখিত: বাংলাদেশ বিষয়াবলি

সুনীল অর্থনীতি কী? বাংলাদেশের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও সরকারি উদ্যোগ | বিসিএস লিখিত

📌 এক নজরে

সুনীল অর্থনীতি বা Blue Economy মানে সামুদ্রিক পরিবেশ ও সম্পদের টেকসই ব্যবহার। ৩৮তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় এ বিষয়ে প্রশ্ন এসেছে। এই পোস্টে ধারণা, সম্ভাবনার ক্ষেত্র, চ্যালেঞ্জ এবং সরকারের কার্যক্রম একটি পূর্ণাঙ্গ উত্তরের কাঠামোয় সাজানো।

(৩৮তম বিসিএস)

“বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সুনীল অর্থনীতির সুফল ভোগ করবে।”

সুনীল অর্থনীতি বা Blue Economy অর্থনীতির এমন একটি বিষয় যেখানে একটি দেশের সামুদ্রিক পরিবেশ কিংবা সামুদ্রিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা করা হয়। সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু-ইকোনমি হচ্ছে সমুদ্রের সম্পদনির্ভর অর্থনীতি। সমুদ্রের বিশাল জলরাশি ও এর তলদেশের বিভিন্ন প্রকার সম্পদকে কাজে লাগানোর অর্থনীতি।

সুনীল অর্থনীতি কী?

সুনীল অর্থনীতি: ব্লু ইকোনমি বা সুনীল অর্থনীতি হচ্ছে সমুদ্রসম্পদ-নির্ভর অর্থনীতি। ১৯৯৪ সালে বেলজিয়ামের অধ্যাপক গুন্টার পাউলি ভবিষ্যতের অর্থনীতির রূপরেখা প্রণয়নের জন্য একটি টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব মডেল হিসেবে সুনীল অর্থনীতির ধারণা দেন। মাছ ও মৎস্যসম্পদের মাধ্যমে খাবার চাহিদা মেটায় সমুদ্র। মানুষ ও পণ্য পরিবহনের একটি মাধ্যম সমুদ্র। এছাড়া সমুদ্র নানা ধরনের প্রাকৃতিক খনিজ সম্পদ, যেমন বালি, লবণ, কোবাল্ট, গ্রাভেল, কপার প্রভৃতির আধার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তেল ও গ্যাস আহরণ ক্ষেত্র হিসেবে সমুদ্রের প্রয়োজন হয়। এসব উপাদান সমষ্টিকেই বলা হয় সুনীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমি।

বাংলাদেশের সম্ভাবনা

সুনীল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনার ক্ষেত্রগুলো: ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশ গঠনে সমুদ্রে পাওয়া এক লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটারের যথাযথ ব্যবহারে সুনীল অর্থনীতি হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের জন্য ট্রাম্পকার্ড। নিচে সুনীল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের সম্ভাবনার ক্ষেত্রগুলো আলোচনা করা হলো:

ক. কিছুদিন আগে গৃহীত হয়েছে বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০ বা ডেল্টা প্ল্যান-২১০০। এ মহাপরিকল্পনায় সমুদ্র অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। পরিকল্পনায় নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পাঁচ ধরনের কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে, যার অন্যতম হলো সামুদ্রিক সম্পদের বহুমাত্রিক জরিপ দ্রুত সম্পন্ন করা। এর মাধ্যমে সরকার সমুদ্র অর্থনীতিকে কাজে লাগানোর জন্য প্রথম ও প্রধান কাজটাই হাতে নিয়েছে।

খ. সমুদ্রবিজয়ের ফলে বাংলাদেশ যে অঞ্চলের মালিকানা পেয়েছে, সেখানে অন্তত চারটি ক্ষেত্রে কার্যক্রম চালানো হলে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতিবছর প্রায় আড়াই লাখ কোটি মার্কিন ডলার উপার্জন করা সম্ভব। ক্ষেত্র চারটি হলো:

তেল-গ্যাস উত্তোলন, মৎস্য সম্পদ আহরণ, বন্দরের সুবিধা সম্প্রসারণ ও পর্যটন।

গ. সৃষ্টির সামুদ্রিক কার্যক্রমের নিমিত্তে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক ব্লু প্রোগ্রামের জন্য ১০০ মিলিয়ন ডলারের ফান্ড গঠন করা হয়েছে, যার সাইনিং সম্পাদিত হয়েছে ২০১৮ সালের নভেম্বরে। বাংলাদেশে সামুদ্রিক খাতেও ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের বিনিয়োগ সম্ভাবনা রয়েছে।

ঘ. বঙ্গোপসাগর তীরে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার ও থাই উপকূলে ১৪৫ কোটি মানুষের বাস। বাংলাদেশের অবস্থান কেন্দ্রে। ফলে এখানে বিপুল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকায় বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার ভালো সুযোগ রয়েছে।

ঙ. বর্তমানে বাংলাদেশের ট্রলারগুলো উপকূল থেকে ৩৫-৪০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে মাছ আহরণ করে। কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক অঞ্চল ২০০ নটিক্যাল মাইল। আরও বিস্তৃত পরিসরে কাজ করে সমুদ্র অর্থনীতিতে দেশের অর্থনীতি সুদৃঢ় করার বিশেষ সুযোগ রয়েছে।

চ. জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বের যে চারটি দেশ মাছ চাষে বিপুল সাফল্য অর্জন করবে, তার মধ্যে প্রথম হচ্ছে বাংলাদেশ। এরপর থাইল্যান্ড, ভারত ও চীন। নতুন জলসীমার অধিকার পাওয়ায় ব্লু ইকোনমি প্রসারে বাংলাদেশের এ সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। তাই সমুদ্র খাতের এ সুযোগ লুফে নেয়াই এখন দরকার।

ছ. ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ২১টি সদস্য দেশের সংগঠন ‘ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন’-এর সদস্য বাংলাদেশ। সুনীল অর্থনীতি নিয়ে এ জোটের বিভিন্ন দেশ কাজ করছে।

জ. ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ হিসাবমতে, বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ৭০ শতাংশ আসে সমুদ্রে মাছ আহরণ, সামুদ্রিক খাদ্য ও বাণিজ্যিক সমুদ্র পরিবহন থেকে। প্রায় তিন কোটি লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এসব কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর মধ্যে কেবল সামুদ্রিক মাছ আহরণে নিয়োজিত আছে ৫০ লাখ মানুষ। এ খাতের আধুনিকায়ন হলে এ সংখ্যা বাড়া কেবল সময়ের ব্যাপার।

ঝ. সিমেন্টশিল্পের কাঁচামাল ‘ক্লে’র সন্ধান পাওয়া গেছে বঙ্গোপসাগরের প্রায় ৩০ থেকে ৮০ মিটার গভীরে। অগভীর সমুদ্রের ক্লে উত্তোলন করা গেলে বাংলাদেশের সিমেন্টশিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে। এছাড়া সমুদ্রতলদেশে মহামূল্যবান ইউরেনিয়াম ও থোরিয়ামের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। বিশ্বে এ ধাতু দুটির চাহিদা কীরূপ তা সহজে অনুমেয়।

ঞ. সমুদ্রনির্ভর অর্থনীতি থেকে যদি চার শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করা যায়, তাহলে ‘ভিশন ২০৪১’ পূরণ করা সহজ হবে। ফলে আমরা এই সময়ের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছে যাব।

চ্যালেঞ্জ

সুনীল অর্থনীতি উন্নয়নে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ: সুনীল অর্থনীতি উন্নয়নের পথে বাংলাদেশের মূল চ্যালেঞ্জগুলো হলো:

  • পর্যাপ্ত নীতিমালা ও সঠিক কর্মপরিকল্পনার অভাব।
  • দক্ষ জনশক্তির অভাব, প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব।
  • সম্পদের পরিমাণ ও মূল্য সম্পর্কে সঠিক তথ্যের অভাব।
  • মেরিন রিসোর্সভিত্তিক গবেষণা না হওয়া।
  • সুনীল অর্থনীতি-সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক যোগাযোগের অভাব এবং গবেষণা কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য গবেষণা জাহাজ না থাকা।

সরকারের কার্যক্রম

সুনীল অর্থনীতি বাস্তবায়নে সরকারের গৃহীত কার্যক্রমসমূহ: স্বাধীনতার সুফল জনগণের মাঝে পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে সমুদ্র সম্পদকে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক Territorial Waters and Maritime Zones Act, 1974 প্রবর্তন করা হয়। সুনীল অর্থনীতি বাস্তবায়নে সরকারের গৃহীত কার্যক্রমসমূহ নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০১৭ সালে ‘ব্লু ইকোনমি সেল’ গঠন করে সরকার।
  • সমুদ্রসম্পদ সুরক্ষায় ২০১৯ সালে মেরিটাইম জোন অ্যাক্ট করেছে সরকার।
  • বর্তমান সরকার সুনীল অর্থনীতির সুযোগগুলোকে কাজে লাগানোর জন্য দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর বিশেষ নজর দিচ্ছে।
  • সমুদ্র গবেষণা ও মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য সাম্প্রতিক কালে সরকার বাংলাদেশ ওশেনোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউট এবং একটি মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করেছে।
  • সমুদ্র অর্থনীতির বিষয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় চুক্তি।
  • নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে বিনিয়োগকারীদের এই খাতে কীভাবে আকৃষ্ট করা যায় এবং এই খাতের কীভাবে উন্নয়ন করা যায়, সে বিষয়ে নজর রাখতে হবে।
  • প্রযুক্তিনির্ভরতা ও দক্ষ জনশক্তি নিয়োগ সম্পর্কে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।
  • বাংলাদেশের সমুদ্রসীমানায় যেসব অনাবিষ্কৃত সমুদ্রসম্পদ আছে, সেগুলোর বিজ্ঞানভিত্তিক ও পরিবেশবান্ধব সংগ্রহ এবং টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
  • সুনীল অর্থনীতির উন্নয়নে বিদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ও পরামর্শ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে, যা আমাদের দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
  • সমুদ্র বিষয়ে পরিকল্পনা, জাতীয় নিরাপত্তা ও জাতীয় ক্ষমতা বিকাশের জন্য নানা রকম উদ্যোগ নেয়া এবং সম্পদ সংরক্ষণ ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়নের জন্য কর্মপন্থা প্রণয়ন, জাহাজ নির্মাণ শিল্প ও সুবিধা বৃদ্ধি এবং পর্যটন ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে হবে।
  • আন্তর্জাতিক সীালঙ্ঘন আইন, সিসিআরএফের ধারাগুলোর সর্বোচ্চ বাস্তবায়ন করতে হবে।
  • সুনীল অর্থনীতির উন্নয়ন ও প্রসারের জন্য সব ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ ও পর্যাপ্ত পরিমাণ বাজেট বরাদ্দ করতে হবে।

উপসংহার

অপার সম্ভাবনাময় এ সুনীল অর্থনীতিকে কাজে লাগানো জরুরি। সমুদ্রের তলদেশে কী ধরনের সম্পদ রয়েছে, সেগুলো আহরণ করতে হলে কোন ধরনের প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞ জনবল প্রয়োজন, তা পরিকল্পনামাফিক নির্ধারণ করে সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাহায্য লাগবে?
BCS Journey Support
● Online
×
💬Messenger ✈Telegram
BCS JOURNEY
BCS Journey
চ্যাট শুরু করুন ➜