● বিসিএস লিখিত: বাংলাদেশ বিষয়াবলি

ভারত, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক: বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে সম্ভাব্য কাঠামো | বিসিএস লিখিত

📌 এক নজরে

ভারত বাংলাদেশের তিন দিক ঘিরে আছে এবং স্বাধীনতাযুদ্ধে পাশে ছিল, অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের বড় অর্থনৈতিক অংশীদার। ৩৭তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় তিন দেশের সম্পর্কের সম্ভাব্য চিত্র আঁকতে বলা হয়েছিল। এই পোস্টে সেই বিশ্লেষণের কাঠামো পাবেন।

ভারত হলো বাংলাদেশের অকৃত্রিম পরমবন্ধু প্রতিবেশী রাষ্ট্র। স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত যেভাবে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল তার ঋণ শোধ হবার নয়। বাংলাদেশের তিন দিক জুড়ে রয়েছে ভারত। বাংলাদেশের অর্থনীতি, রাজনীতি এবং পররাষ্ট্রনীতিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে ভারতের একটি অদৃশ্য প্রভাব দেখা যায়। যুদ্ধের সময় ভারত সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে বন্ধুত্বের পরিচয় দিলেও দিন দিন দেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে উভয় দেশের সম্পর্ক খারাপ হতে থাকে। বাংলাদেশ-ভারত উভয় দেশই গণতান্ত্রিক দেশ হওয়া সত্ত্বেও সার্বিকভাবে ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ বজায় ছিল। অন্যদিকে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় চীন সহযোগিতার হাত না বাড়ালেও স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীন বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছে। সেই বন্ধুত্বের হাত দিন দিন প্রসারিতই হয়েছে। এদিকে চীন ও ভারত পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। বাংলাদেশের কাছে ভারত ও চীনের চাহিদা ভিন্ন-ভিন্ন।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বাংলাদেশ ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়’ এ নীতি অনুসরণ করে বৈদেশিক সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ভারত ও চীনের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে তীব্র দ্বন্দ্ব লক্ষ্য করলেও বাংলাদেশ তার সার্বিক কল্যাণের স্বার্থে চির প্রতিদ্বন্দ্বী এ দু’দেশের সাথে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট হয়। বর্তমানে ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ভারত, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সম্পর্কের সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরা হলো-

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

বাংলাদেশ ও ভারত সম্পর্ক: বাংলাদেশ-ভারত এর মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের শুরুটা হয়েছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহায়তার জন্য দুই দেশ ‘রক্তঋণ’-এ বাঁধা পড়ে আছে। ভারতের সাথে সম্পর্ক যত গভীর, যত গুরুত্বপূর্ণই হোক না কেন, বাংলাদেশের সাথে কিছু বিষয় নিয়ে টানাপোড়েন, কিছু স্বার্থের সংঘাত রয়েছে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিম্নে তুলে ধরা হলো-

১) পানি বণ্টন সমস্যা: অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন বাংলাদেশ এবং ভারতের মধ্যে এক দীর্ঘমেয়াদী অমীমাংসিত ইস্যু। স্বাধীনতা লাভের পরপরই বাংলাদেশ পানি বণ্টন সমস্যার সম্মুখীন হয়। বাংলাদেশ ও ভারতের উপর দিয়ে প্রবাহিত আন্তঃসীমান্ত নদী বা অভিন্ন নদীর সংখ্যা ৫৪টি। প্রায় সবকটি নদীর প্রবাহই ভারতের ভেতর দিয়ে আসায় ভারত ইচ্ছা করলেই বাঁধ দিয়ে পানি

  • ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষাপটেআন্তর্জাতিক সম্পর্ক
  • বাংলাদেশ ও ভারত
  • ভারত ও চীন
  • বাংলাদেশ ও চীন
  • পানি সমস্যা
  • সীমান্ত সংঘর্ষবন্ধে ব্যবস্থা
  • সমুদ্রসীমাবিরোধ
  • ট্রানজিটও ট্রান্সমিশন
  • মুক্তবাণিজ্য চুক্তি
  • বাণিজ্য সম্পর্ক
  • সীমান্ত সমস্যা নিরসনেকার্যকর পদক্ষেপ
  • প্রতিদ্বন্দ্বীতারমনোভাব পরিহার
  • আধিপত্য বিস্তারমনোভাব পরিহার
  • কূটনৈতিকসুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা
  • অস্ত্র প্রদর্শন পরিহার
  • আঞ্চলিক আধিপত্য
  • পানি নিয়ে বিরোধ
  • ঐতিহাসিকসম্পর্ক
  • স্বাধীনতাপরবর্তী সম্পর্ক
  • অর্থনৈতিকসম্পর্ক
  • বিনিয়োগসম্পর্ক
  • বাণিজ্যসম্পর্ক
  • সামরিকসম্পর্ক

প্রবাহ বন্ধ করে দেয়। গঙ্গা, তিস্তাসহ অধিকাংশ নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের সাথে বিভিন্ন সময়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও ভারত কখনোই চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশকে পানি দেয়নি। শুকনো মৌসুমে তিস্তার পুরো পানিই ব্যবহার করছে ভারত।

সীমান্ত ও সমুদ্রসীমা

২) সীমান্ত সংঘর্ষ বন্ধে ব্যবস্থা: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৪,১৫৬ কি.মি. আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে। দু’দেশের সীমান্তে বিভিন্ন সময় সংঘর্ষ হয়ে থাকে। যেমন-২০১১ সালে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষীবাহিনী BSF কোনো কারণ ছাড়াই বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার বড়াইবাড়ী বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) ক্যাম্পের উত্তর-পূর্ব সীমান্তে অনুপ্রবেশ করে। এ সময় দুপক্ষে সংঘর্ষে BSF বাহিনীর গুলিতে ২ জন BDR জোয়ান নিহত হয় অপরদিকে BSF অফিসারসহ ১৬জন নিহত হয়। ২০০৫ সালে আখাউড়া উপজেলার বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সংঘর্ষ হয়। এখনও বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে সংঘর্ষ, অপহরণ, বাংলাদেশীকে গুলি করে হত্যা ইত্যাদি বন্ধ হয়নি। ২০১১ সালে BSF এর গুলিতে নিহত হয় নিষ্পাপ কিশোরী ফেলানী। ফেলানীর মরদেহ কাঁটাতারে ঝুলে থাকা ছবি বিশ্বজুড়ে সংবাদ মাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। অতিশীঘ্র সীমান্ত হত্যা বন্ধ না করতে পারলে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটবে।

৩) সমুদ্রসীমা বিরোধ: নেদারল্যান্ডের স্থায়ী সালিশ আদালতে বাংলাদেশ ও ভারতের সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির মামলা করা হয় ২০১২ সালের ১৪ মার্চ। মামলার রায় দেওয়া হয় ৭ জুলাই, ২০১৪ সালে। এ বিরোধ নিষ্পত্তির ফলে বাংলাদেশ তার নিজস্ব সমুদ্রসীমার বাইরে মহীসোপানে এক বিরাট এলাকার উপর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। বিরোধপূর্ণ আনুমানিক ২৫ হাজার ৬০২ বর্গ কিলোমিটার সমুদ্র এলাকার মধ্যে বাংলাদেশ পাবে ১৯ হাজার ৪৬৭ বর্গ কিলোমিটার এবং ভারত পাবে ৬ হাজার ১৩৫ বর্গ কিলোমিটার। এই রায়ের ফলে বঙ্গোপসাগরের এই এলাকায় মৎস্য আহরণ ও সমুদ্রের তলদেশে প্রাকৃতিক সম্পদ অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাংলাদেশের অধিকার নিশ্চিত হয়েছে। এই বিষয়টি সুরাহা হওয়ায় বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গ কিলোমিটারের টেরিটোরিয়াল সমুদ্রে ২০০ নটিক্যাল মাইল একচ্ছত্র অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং চট্টগ্রাম উপকূল থেকে ৩৫৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত মহীসোপানের তলদেশে অবস্থিত সব ধরনের প্রাণিজ ও অপ্রাণিজ সম্পদের উপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

গভীর সমুদ্রে প্রস্তাবিত ১০টি তেল-গ্যাস ব্লকই পড়েছে বাংলাদেশে আর পানির নিচে তলিয়ে যাওয়া বহুল আলোচিত তালপট্টি দ্বীপ বঙ্গোপসাগরের যে জায়গায় ছিল তা ভারতের মধ্যে পড়েছে। এই রায়ের ফলে ভারতের সাথে বাংলাদেশের তিন দশকের বেশি সময় ধরে বিদ্যমান সমস্যা আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে।

ট্রানজিট ও বাণিজ্য

৪) ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট: একটি দেশ দ্বিতীয় দেশের ভূ-খণ্ড ব্যবহার করে তৃতীয় কোনো দেশের জন্য পণ্য বহন করে নিয়ে যায় তখন তা হয় প্রথম দেশটির জন্য ট্রানজিট সুবিধা। ভারতের প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদের ভাণ্ডার ৭টি রাজ্য হলো- ত্রিপুরা, আসাম, মেঘালয়, মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল। এই সাতটি রাজ্য মূল ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন এবং বাংলাদেশের ভূমির কাছাকাছি হওয়ায় ভারত বাংলাদেশের নিকট আটক রয়েছে। অভ্যন্তরীণ দ্রুত যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার জন্য ভারত বাংলাদেশের উপর দিয়ে এ সাতটি রাজ্যে যাওয়ার একটি ট্রানজিট দাবি করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে ভারত তার উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর সাথে যোগাযোগের জন্য ট্রানজিট সুবিধা পেলে তার ১৮০০ কি. মি. সড়ক দূরত্ব কমে যাবে। বাংলাদেশের তরফ থেকে ভারতের শিলিগুড়ি করিডোর খুলে দেওয়ার দাবি হচ্ছে। যাতে বাংলাদেশ সহজেই নেপাল-ভুটান এবং চীনের সাথে যোগাযোগ করতে পারে।

৫) মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি: বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি হওয়ার ফলে বাংলাদেশ নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছে। ভারত বাংলাদেশের তুলনায় উন্নত রাষ্ট্র বলে অধিক পণ্য উৎপাদন করতে পারে এবং পণ্যের গুণগতমানও বেশি। কিন্তু বাংলাদেশ সে তুলনায় পণ্য উৎপাদন করতে পারে না। ভারত অতি সহজে বাংলাদেশের বাজার দখল করে নেবে। এর ফলে বাংলাদেশের উৎপাদিত পণ্য অবিক্রিত থেকে যাবে এবং অনেক শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে। শুধু ভারতের জন্য বাংলাদেশের জন্যও ভারতের বাজার উন্মুক্ত করে দিতে হবে। যাতে করে বাংলাদেশি পণ্য বাধাহীনভাবে ভারতের সকল স্থানে পৌঁছাতে পারে।

৬) বাণিজ্য সম্পর্ক: ২০২০ সালের এপ্রিল-আগস্ট মাসে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ২৭৩ কোটি ৫০ লাখ ২০ হাজার ডলার বাণিজ্য হয়েছে। আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্য পরিচালনায় বাংলাদেশ ভারত ঘোষিত স্থলবন্দরের সংখ্যা ২৩টি। বাংলাদেশ ভারতে রপ্তানি করে এমন পণ্যের মধ্যে আছে পোশাক শিল্পের ওভেন ও নিটওয়্যার, হোম টেক্সটাইল, কৃষিপণ্য, হিমায়িত খাদ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কাঁচা পাট, পাটজাত পণ্য, বাই সাইকেল ও ফুটওয়্যার। অন্যদিকে বাংলাদেশ ভারত থেকে আমদানি করে এমন পণ্যের মধ্যে রয়েছে- পেঁয়াজসহ মসলা জাতীয় পণ্য, তুলা, সুতা, যানবাহন, সবজি, প্লাস্টিক, লবণ, বৈদ্যুতিক পণ্য, দুগ্ধজাত পণ্য, ফল ও কাগজসহ আরো অনেক পণ্য।

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক: বাংলাদেশ ও চীন সম্পর্ক প্রাচীন ও প্রায় ৩ হাজার বৎসরের পুরোনো। প্রাচীনকাল থেকে ব্রহ্মপুত্র নদীর মাধ্যমে চীন এবং বাংলায় মানুষের যোগাযোগ স্থাপিত হয়। চীন বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পরই চীন সরকার কট্টর পাকিস্তান ঘেঁষা নীতি অনুসরণ করলেও স্বাধীনতার পর চীন তাঁর নিজ স্বার্থেই বাংলাদেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহ প্রকাশ করে। নিম্নে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের চিত্র তুলে ধরা হলো—

১) ঐতিহাসিক সম্পর্ক: বাংলাদেশকে চীনের সঙ্গে যুক্ত করেছিল যে পথ তা ‘সিল্ক রোড’ নামে ইতিহাসে প্রসিদ্ধ ছিল। পশ্চিমা সিল্ক রোডের সূচনা হয়েছিল তৎকালীন রাজধানী সিয়ান থেকে। একটি পূর্ব সিল্ক রোডও ছিল, যার উৎপত্তি হয়েছি দক্ষিণ চীনের কুনমিং থেকে। মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে এসে বাংলাদেশের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করেছিল। এই দুটি পথ ধরেই দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটেছিল, বৃদ্ধি পেয়েছিল সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান। তাছাড়া প্রাচীনকাল থেকেই চীন ও বাংলাদেশ উভয়ই সমুদ্র উপকূলীয় দেশ বিধায় সমুদ্রপথেও তাদের মধ্যকার চমৎকার আদান-প্রদান ছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশের এই প্রাচীন বন্ধুপ্রতীম দেশ পাকিস্তানকে সমর্থন করায় দু’দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

২) স্বাধীনতা পরবর্তী সম্পর্ক: চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ছন্দপতন ঘটে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে। সোভিয়েত রাশিয়া ও ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের পক্ষ নিলে চীন দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র দেশ হিসেবে পাকিস্তানের পক্ষাবলম্বন করে। বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর অনেকটা সময় কেটে গেলেও ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। বরং জাতিসংঘের সদস্য পদপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে চীন বিরোধিতা করে। অবশেষে ১৯৭৫ সালের ৩১শে আগস্ট চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়। কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পর আজও পর্যন্ত সুসম্পর্কই রয়েছে। চীনারা বলে “মনের মিল থাকলেই কেবল দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব হতে পারে।” কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর ৪৫ বছর ধরেই চীন বাংলাদেশকে আন্তরিক বন্ধু ও উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে গণ্য করে আসছে।

অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও সামরিক সম্পর্ক

৩) অর্থনৈতিক সম্পর্ক: চীন ও বাংলাদেশের জনগণ প্রাচীনকাল থেকেই পরস্পরের ভালো বন্ধু ও প্রতিবেশী। দু’দেশই নিজ নিজ দেশে উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য তারা নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়েছেন এবং সফল হয়েছেন। চীনের অর্থনীতির উন্নতি-অবনতি দুইয়ের প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বাণিজ্যিক অংশীদার। চীনের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি অনেক বেশি। এত বাণিজ্য ঘাটতি থাকে সত্ত্বেও চীন প্রতিবছর বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণস্বরূপ পোশাক শিল্পের ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ কাঁচামাল আসে চীন থেকে। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের কাঁচামালের প্রধান উৎসও চীন।

৪) বিনিয়োগ সম্পর্ক: চীন সবসময় দু’দেশের সম্পর্কোন্নয়নের উপর অত্যন্ত গুরুত্ব দেয় এবং কেন্দ্রীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ইস্যুতে পরস্পরের পাশে থাকার নীতিতে বিশ্বাস করে। বাংলাদেশে চীনের বৃহৎ বিনিয়োগ রয়েছে। পদ্মা সেতু, পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেল সংযোগ, ঢাকা বাইপাস, মেট্রোরেলের মতো মেগা প্রকল্পের কাজগুলো করছে চীনা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রকল্পে প্রায় দেড় হাজার চীনা নাগরিক কাজ করছে।

৫) বাণিজ্য সম্পর্ক: বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তি চীন। দক্ষিণ এশিয়ার জনবহুল ছোট দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশ-চীন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সম্পর্ক বেশ ভালো। সম্প্রতি চীনের দেয়া ৯৭ শতাংশ শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুযোগ দেয়া হয়েছে। এটি ২০২৪ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এতে শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় চীনের বাজারে বাংলাদেশের ৮ হাজার ২৫৬টি পণ্য এসেছে।

৬) সামরিক সম্পর্ক: চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে সব সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে প্রতিরক্ষা। বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি অস্ত্র আমদানি করে চীন থেকে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশ সরকার নৌবাহিনীর জন্য দুটি সাবমেরিন ক্রয় করার লক্ষ্যে চীনের সাথে একটি চুক্তি করে। ২০১৬ সালের ১৪ নভেম্বর চীন সাবমেরিন দুটি বাংলাদেশের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করে। এগুলোর নামকরণ করা হয় ‘বানৌজা নবযাত্রা ও বানৌজা জয়যাত্রা’।

উভয়ের সাথে ভারসাম্য

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী লর্ড পামারস্টোনের একটি উক্তি আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে অমর হয়ে আছে— “আমাদের কোনো চিরস্থায়ী বন্ধু নেই এবং আমাদের কোনো চিরস্থায়ী শত্রু নেই। কেবল আমাদের স্বার্থই চিরস্থায়ী আর আমাদের কর্তব্য হচ্ছে সেই স্বার্থ অনুযায়ী চলা।” বাস্তবিক অর্থেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু বা বন্ধু বলতে কিছু নেই, রয়েছে শুধু চিরস্থায়ী স্বার্থ। একটি অনুন্নত ও যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ তৎকালে চলমান স্নায়ুযুদ্ধ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকার প্রয়োজন অনুভব করছিল এবং বাংলাদেশের পুনর্গঠনের জন্য প্রচুর বৈদেশিক সহায়তার প্রয়োজন ছিল। এজন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী

লীগ সরকার ভারত ও চীন উভয়ের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে কাজ করেছে। বর্তমানেও এশিয়ার দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্র চীন ও ভারতের মধ্যে শত্রুতার সম্পর্ক নয় বরং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রেখেই নিজেদেরকে শক্তিশালী করে তুলছে।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাহায্য লাগবে?
BCS Journey Support
● Online
×
💬Messenger ✈Telegram
BCS JOURNEY
BCS Journey
চ্যাট শুরু করুন ➜