পররাষ্ট্রনীতি বা Foreign Policy হলো কোনো একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন। প্রতিটি রাষ্ট্র, তার নিজ দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করে আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার দিগন্তকে প্রসারিত করে। জার্মান রাষ্ট্রনায়ক অটোডন বিসমার্ক পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে বলেছেন, “The Extension of domestic Policy is foreign policy.”
প্রতিটি দেশ কিছু লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির নিয়ামকসমূহ দুভাগে বিভক্ত করা যায়। যথা: ১) অভ্যন্তরীণ নির্ধারক ২) আন্তর্জাতিক নির্ধারক।
অভ্যন্তরীণ নির্ধারক
১) অভ্যন্তরীণ নির্ধারক: রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ যে সকল উপাদান ঐ রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি প্রণয়নে ভূমিকা রাখে তাকে অভ্যন্তরীণ নির্ধারক বলে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নির্ধারকগুলো হলো:
ক) ভূ-রাজনৈতিক উপাদান: ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান যেকোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রবর্তনের পিছনে প্রতিবেশী দেশ ভারতকে অনেক বড় একটা ফ্যাক্টর বলে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশের তিন দিক ভারত কর্তৃক পরিবেষ্টিত বলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। ভারতকে উপেক্ষা করে নয় বরং ভারতকে বিবেচনায় রেখে পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশ কৌশলগত নীতি গ্রহণ করে।
খ) ভূ-অর্থনৈতিক উপাদান: কোনো রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তি তার সামর্থ্যের সূচক। অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ঐ সামর্থ্যের প্রভাব দেখা যায়। প্রাকৃতিক সম্পদের অভাব কোনো দেশকে অন্যান্য দেশের উপর নির্ভরশীল করে তুলে। এর ফলে পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে তার প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা কমে যায়। তাই দেখা যায়, কোনো দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, সমুদ্র যোগাযোগ, ভূ-প্রকৃতি সে দেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে অনেক ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ একটি অনুন্নত দেশ। বাংলাদেশে সম্পদের অপ্রতুলতা থাকার কারণে বাংলাদেশকে পুঁজি ও প্রযুক্তির জন্য উন্নত দেশসমূহের উপর নির্ভর করতে হয়। এজন্য বাংলাদেশকে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নকালে এসকল দিক বিবেচনা করতে হয়।
গ) ভৌগোলিক পরিস্থিতি: কোনো দেশের ভৌগোলিক অবস্থান, আকার, আয়তন দেশটির পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। নেপোলিয়ন বোনাপার্ট বলেন – “একটি দেশের বৈদেশিক নীতি তার ভূগোল দ্বারা নির্ধারিত হয়।” বাংলাদেশের তিনদিক ভারত দ্বারা এবং একদিক বঙ্গোপসাগর বেষ্টিত হওয়ার কারণে ভারতকে প্রাধান্য দিতে হয়। ভৌগোলিকগত এই অবস্থান বাংলাদেশের জন্য ক্ষতিকারক। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চীনের সাথে বাংলাদেশকে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হয়।
- বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিপ্রণয়নের নিয়ামকসমূহ
- অভ্যন্তরীণ নির্ধারক
- আন্তর্জাতিক নির্ধারক
- ভূ-রাজনৈতিক উপাদান
- ভূ-অর্থনৈতিক উপাদান
- ভৌগোলিক পরিস্থিতি
- জাতীয় শক্তি ওরাজনৈতিক চেতনা
- ইতিহাস ও সামাজিকঐতিহ্যগত উপাদান
- বিশ্ব রাজনীতি
- আন্তর্জাতিক সংস্থা
- আন্তর্জাতিক আইন
- জোট ও চুক্তি
ঘ) জাতীয় শক্তি ও রাজনৈতিক চেতনা: জনসংখ্যাকে পররাষ্ট্রনীতির একটি উল্লেখযোগ্য নির্ধারকরূপে গণ্য করা হয়। জনসাধারণের গুণগতমান, রাজনীতি সচেতন জনগণ, শিক্ষার প্রসার রাজনৈতিক চেতনা, সরকারের ধরন প্রভৃতি পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের প্রধান পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে পররাষ্ট্রনীতিতে রদবদল করেন। তাই এখানে সঠিক নেতৃত্ব অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। তাছাড়া সরকারের বিরোধী রাজনৈতিক দল, চেম্বার অব কমার্স, আমলাতন্ত্র, এনজিও এবং কোন কোন ক্ষেত্রে সামরিক প্রভাব পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে নিয়ামক শক্তি হিসেবে কাজ করে।
ঙ) ইতিহাস ও সামাজিক ঐতিহ্যগত উপাদান: প্রতিটি ইতিহাস ও সামাজিক ঐতিহ্যগত উপাদান দ্বারাও তাঁর পররাষ্ট্রনীতি প্রভাবিত হয়। ইতিহাস, ভাষা, জনসংখ্যা সভ্যতা, নৃ-তত্ত্ব, জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মতাদর্শ প্রভৃতি একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে অন্যতম নির্ধারক উপাদান হিসেবে স্বীকৃত।
আন্তর্জাতিক নির্ধারক
(২) আন্তর্জাতিক নির্ধারক: পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে যে সকল আন্তর্জাতিক নিয়ামক প্রভাব রাখে সেগুলো হলো:
ক) বিশ্ব রাজনীতি: যে কোনো দেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে বিশ্বরাজনীতি ব্যাপক ভূমিকা পালন করে। বিশ্ব রাজনীতিকে তাই পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের নির্ধারক ধরা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় যেহেতু ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের পক্ষে ছিল তাই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারত ও সোভিয়েতকে ঘিরে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির সূচনা ঘটে।
খ) আন্তর্জাতিক সংস্থা: কোনো দেশ আন্তর্জাতিক সংগঠনের সদস্য হলে সে দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ঐসকল আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশ জাতিসংঘ, WB, IMF, Commonwealth, WTO, UNESCO প্রভৃতি সংগঠনের সদস্যপদ গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি দেখলে বুঝা যাবে এসকল আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর প্রভাব বিরাজমান। বাংলাদেশ এ সকল সংগঠনের নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করে।
গ) আন্তর্জাতিক আইন: আন্তর্জাতিক আইন হলো বিভিন্ন রাষ্ট্রের সমন্বয়ে সৃষ্ট আইন। এ আইনের মাধ্যমে এক রাষ্ট্র বা জাতির সাথে অন্য রাষ্ট্র বা জাতির সম্পর্ক নির্ধারণ করে। আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিকে সামনে রেখে প্রতিটি রাষ্ট্র তাদের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করে। আন্তর্জাতিক আইন বিশ্বের সকল রাষ্ট্র ও সংগঠনের সম্পর্ক নির্ণয় ও নিয়ন্ত্রণ করে।
ঘ) জোট ও চুক্তি: কোনো রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি ও জোটের ব্যাপক প্রভাব থাকে। এসব জোট ও চুক্তি রাষ্ট্রকে অন্য রাষ্ট্রের সাথে সহাবস্থান করতে শেখায় এবং কোনো রাষ্ট্রবিরোধী নীতি প্রণয়নে বাধা প্রদান করে। বাংলাদেশ যে সকল জোট ও চুক্তির সাথে জড়িত তাদের নিয়ম-নীতিকে লক্ষ্য করে পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়ন করে।
উপসংহার
পরিশেষে আমরা বলতে পারি ভৌগোলিক অবস্থান, ভূ-রাজনীতি, ভূ-অর্থনীতি, বিশ্বরাজনীতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতিগুলো প্রণয়ন করেছে।
আরও পড়ুন
- ভারত, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক: বর্তমান ভূ-রাজনীতিতে সম্ভাব্য কাঠামো→
- বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কায় বাংলাদেশ: প্রস্তুতি ও করণীয়→
- বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা: প্রতিরোধ, প্রস্তুতি, সাড়াদান ও পুনরুদ্ধার→
- হাওর অঞ্চলের মানুষের সমস্যা ও জীবনমান উন্নয়নের উপায়→
- সুনীল অর্থনীতি কী? বাংলাদেশের সম্ভাবনা, চ্যালেঞ্জ ও সরকারি উদ্যোগ→
