১১১ দফা কর্মসূচি২গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য৩স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে পার্থক্য নিম্নরূপ-
উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়। ছাত্র অসন্তোষকে কেন্দ্র করে ১৯৬৮ সালের নভেম্বর মাসে যে ঘটনাবলির সূত্রপাত তা পরবর্তীকালে কেবল সমাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ছড়িয়ে পড়ে শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান ছিল আইয়ুব খানের শাসনামলে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী আন্দোলন। এটি শুরু হয়েছিল সরকারি নির্যাতন বিরোধী একটি সাধারণ লড়াই হিসেবে। কিন্তু অচিরেই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের রূপ নিয়ে তা ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রাম-গঞ্জে।
১১ দফা কর্মসূচি
- ১গণআন্দোলন সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গেলেই বলতে হয় ১১ দফার কথা। এ কর্মসূচির ফলে ছাত্র সমাজ স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে এক প্রতিরোধ ও দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলে। ১১ দফা ও ৬ দফার মন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে দেশব্যাপী এক প্রচণ্ড গণ বিপ্লবের সৃষ্টি হয়। এ গণ আন্দোলনের গতি প্রকৃতি লক্ষ্য করে ক্ষমতাসীন সরকার দিশেহারা হয়ে পড়ে।
- ২এ আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে আইয়ুব খান শেখ মুজিবসহ সকল রাজবন্দিকে বিনাশর্তে মুক্তি প্রদান করেন। তীব্র আন্দোলনের মুখে আইয়ুব খান শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ত্যাগ করতেও বাধ্য হন।
- ৩এ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গ্রাম ও শহরাঞ্চলে শ্রেণি চেতনার উন্মেষ ঘটে এবং শ্রেণি সংগ্রামের আংশিক বিকাশ সাধিত হয়।
- ৪এ আন্দোলনের সুফল হিসেবে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা ও সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রতিনিধি নির্বাচনের স্বীকৃতি মিলে।
- ৫এ আন্দোলনের ফলে সবচেয়ে বড় লাভ হলো স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে বাঙালির যে জাতীয়তাবোধ ১৯৪৮ এর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল তা পূর্ণতা লাভ করে।
- ৬এ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই পূর্ব বাংলায় পৃথক রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পায়। শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার চেতনা জনপ্রিয়তা লাভ করে, যার ফলে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পায়।
- ৭১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান জাতীয় চেতনার প্রতীক একুশে ফেব্রুয়ারিকে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। এ সময় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছিল। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা ২১ ফেব্রুয়ারিকে ছুটির দিন ঘোষণা করেছিল। কিন্তু ১৯৫৮ সালে সামরিক আইন জারির পর এ ছুটি বাতিল হয়ে যায়। ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের ফলস্বরূপ ২১ ফেব্রুয়ারি পূর্বের মর্যাদা ফিরে পায়।
- ৮১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পিছনে ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রভাব ছিল প্রত্যক্ষ এবং সক্রিয়।
গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য
সর্বোপরি ‘৬৯- এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্যদিয়ে পূর্ব বাংলায় যে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠে’ ৭০এর নির্বাচনে তা পুরোপুরি আওয়ামী লীগের পক্ষে চলে যায়। ১৯৬৯-এর আন্দোলন ছিল পূর্ব বাংলার ইতিহাসে বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্যে একটি ভিন্ন চরিত্রের এবং নিঃসন্দেহে পাকিস্তানের বাইশ বছরের গণ আন্দোলনসমূহের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ‘৬৯এর গণঅভ্যুত্থান বাঙালি জাতির জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটিয়েছিল এবং স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল।
কখনও সু-সম্পর্ক ও সুভ্রাতৃত্ব গড়ে উঠতে পারেনি। ভৌগোলিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈসাদৃশ্যের মতো দুই অঞ্চলের অর্থনৈতিক বৈষম্য ও ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মুক্তিযুদ্ধের সূচনা হলেও পটভূমি তৈরি হয়েছিল পাকিস্তানি শাসন-শোষণের ২৩ বছর ধরে। সাধারণত ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধকে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ উভয়টি বলা হয়ে থাকে। স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধকে আমরা একই অর্থে ব্যবহার করলেও শব্দযুগলের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য বিদ্যমান। পার্থক্য আছে বলেই যুদ্ধের পর জিয়াউর রহমানের শাসনকালে সংবিধানে যে পরিবর্তন আনা হয়েছিল তাতে ‘মুক্তি’ শব্দটি সরিয়ে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি বসানো হয়েছিল। পরবর্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ এ বিষয় দুটো নিয়ে বিস্তার আলোচনা হয়।
স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে পার্থক্য নিম্নরূপ-
- ১‘স্বাধীনতা’ শব্দের অর্থ মুক্তি, স্বাচ্ছন্দতা, বাধা-হীনতা। সংগ্রাম শব্দের অর্থ আন্দোলন, যুদ্ধ, লড়াই। সুতরাং স্বাধীনতা সংগ্রামের অর্থ স্বাধীনতার জন্য লড়াই। অপরদিকে মুক্তি শব্দের অর্থ নিষ্কৃতি, রেহাই, পরিত্রাণ, স্বাধীনতা, মোক্ষ। যুদ্ধ শব্দের অর্থ লড়াই, বিগ্রহ, দ্বন্দ্ব। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের অর্থ সার্বিক মুক্তির জন্য যে যুদ্ধ।
- ২মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১ সালের ব্যাপার কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ, সংগ্রাম একাত্তরে শুরু হয়নি, শেষও হয়নি।
- ৩মুক্তিযুদ্ধের ধারণাটি অনেক ব্যাপক ও গভীর ব্যাপার; এর সাথে রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি সব ধরনের বিষয় জড়িত। স্বাধীনতা সংগ্রামের ফল শ্রুতিতে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ঘটে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ফলে স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা ঘটেছে এমনটা বলা যায় না।
- ৪স্বাধীনতা সংগ্রামের মূল উদ্দেশ্য কোনো নির্দিষ্ট ভূ-খণ্ড থেকে কোনো ঔপনিবেশিক শাসকগোষ্ঠীকে বিতাড়িত করে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে আসা। যেমন- আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধ। অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য হলো স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, বৈষম্য থেকে মুক্তি লাভ। যেমন- ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ।
- ৫রাষ্ট্র গঠনে প্রথম পদক্ষেপ বলে বিবেচিত স্বাধীনতা। যে কোনো রাষ্ট্রের জনগণের মুক্তি হলো চূড়ান্ত লক্ষ্য।
- ৬সাধারণত কোনো ভূ-খণ্ড স্বাধীন হলে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম তা স্তিমিত হয়ে যায়। কিন্তু স্বাধীনতা অর্জন হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ থেমে থাকে না বরং সমাজে মানুষের সব ধরনের অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ চলতে থাকে।
- ৭মুক্তিযুদ্ধের মতো বড় ঘটনা বাংলাদেশে আগে কখনো ঘটেনি কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ের ঘটনা অনেকবার ঘটেছে।
- ৮সাধারণত পরাধীনতার বিপরীতে ব্যবহৃত হয় স্বাধীনতা। অপরদিকে সামগ্রিক দাসত্বের বিপরীতে ব্যবহৃত হয় মুক্তি।
- ৯বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে যত মানুষ প্রাণ দিয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামের বিভিন্ন পর্যায়ে তত মানুষ প্রাণ দেয়নি।
- ১০মুক্তিযুদ্ধের পেছনে যে চেতনা সেগুলো রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতিতে প্রতিফলিত হয়েছে কিন্তু স্বাধীনতা সংগ্রামের চেতনা সমূহ রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতিতে সম্পূর্ণরূপে প্রতিফলিত হয়নি।
- ১১বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনেকগুলো পর্যায়। স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ অধ্যায়টি হলো মুক্তিযুদ্ধ।
আরও পড়ুন
- ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭: ব্রিটিশ শাসনামলের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা→
- লাহোর প্রস্তাব ১৯৪০: ধারা ও গুরুত্ব→
- যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৪: গঠনের পটভূমি ও নির্বাচনের ফলাফল→
- মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা→
- মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান→
