১সংক্ষিপ্ত সময়রেখা২উল্লেখযোগ্য ঘটনাসমূহ৩বিংশ শতকের আন্দোলন৪উপসংহার
১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত প্রায় দুইশ বছরের ঔপনিবেশিক শাসনামল ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে এক সুদূরপ্রসারী ও মৌলিক পরিবর্তনের অধ্যায়। পলাশীর প্রান্তরে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার মধ্য দিয়ে যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের সূচনা হয়, তা পরবর্তীতে ব্রিটিশ রাজশক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এই দীর্ঘ সময়কালে কেবল রাজনৈতিক শোষণই চলেনি, বরং বহু আন্দোলন, বিদ্রোহ, প্রশাসনিক সংস্কার এবং সাংস্কৃতিক জাগরণ ঘটেছিল। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম ছিল মূলত এই ঔপনিবেশিক শাসনের অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে ভারতীয় উপমহাদেশের জনগণের সম্মিলিত প্রতিরোধ।
এক নজরে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ (১৭৫৭-১৯৪৭):
সংক্ষিপ্ত সময়রেখা
- ১৭৫৭: পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় এবং বাংলায় ইংরেজ শাসনের সূচনা।
- ১৮১৩: ইংল্যান্ডের সাথে ভারতের বাণিজ্যিক সম্পর্কের জন্য রেগুলেশন এক্ট পাস।
- ১৮৫৭: ভারতের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম সিপাহী বিদ্রোহ।
- ১৮৬১: ভারতীয় পুলিশ আইন প্রবর্তন।
- ১৮৭৭: রানী ভিক্টোরিয়ার আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ভারত সম্রাজ্ঞী’ উপাধি গ্রহণ।
- ১৮৮৫: ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা।
→ ১৯০৫: বঙ্গভঙ্গ হয়, যার প্রতিবাদে স্বদেশী আন্দোলন শুরু হয়।
→ ১৯১১: বঙ্গভঙ্গ রদ হয় এবং দিল্লিকে ভারতের রাজধানী ঘোষণা করা হয়।
→ ১৯১৯: জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ড।
→ ১৯২০-২২: মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন।
→ ১৯৩০-৩১: লবণ আইন ভঙ্গের জন্য মহাত্মা গান্ধীর প্রতিবাদ।
→ ১৯৪২: ভারতীয় স্বাধীনতার দাবিতে ভারত ছাড় আন্দোলন।
→ ১৯৪৭: ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
উল্লেখযোগ্য ঘটনাসমূহ
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলের (১৭৫৭-১৯৪৭) উল্লেখযোগ্য ঘটনাসমূহ: ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে বিভিন্ন পালাবদল ভারতীয় উপমহাদেশের সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন এনেছিল। সেই ঘটনাসমূহ নিচে আলোচনা করা হলো:
→ পলাশীর যুদ্ধ ও ইংরেজ শাসনের সূচনা (১৭৫৭): এই যুদ্ধে বাংলার স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে ভারতে ইংরেজদের রাজনৈতিক আধিপত্য শুরু হয়। মীরজাফর, জগৎশেঠ, এবং উমিচাঁদের মতো স্থানীয় ব্যক্তিদের বিশ্বাসঘাতকতা ইংরেজদের জন্য সুযোগ তৈরি করে দেয়। এই বিজয়ের ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি প্রথমে বাংলায় এবং ধীরে ধীরে সমগ্র ভারতে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। এর মাধ্যমে ভারতীয় উপমহাদেশের সম্পদ ইংল্যান্ডে পাচার হওয়া শুরু হয় এবং বাংলায় দ্বৈত শাসন-এর ভিত্তি তৈরি হয়।
→ চার্টার অ্যাক্ট (১৮১৩): এই আইনটি ছিল ব্রিটিশ কোম্পানির শাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের অবসান ঘটিয়ে ব্রিটিশ নাগরিকদের জন্য ভারতের বাণিজ্যপথ উন্মুক্ত করে দেয়। এর ফলে ভারতে অবাধ পুঁজিবাদের অনুপ্রবেশ ঘটে, যা ব্রিটিশ শিল্প বিপ্লবের উৎপাদিত পণ্য বিক্রির জন্য এক বিশাল বাজার তৈরি করে। একইসঙ্গে এটি ভারতে খ্রিস্টান মিশনারিদের শিক্ষা ও ধর্ম প্রচারের সুযোগ তৈরি করে দেয়।
→ সিপাহী বিদ্রোহ (১৮৫৭): এনফিল্ড রাইফেলের টোটা নিয়ে শুরু হওয়া এই বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম ব্যাপক সশস্ত্র গণ-অভ্যুত্থান। যদিও এ বিদ্রোহ সফল হয়নি, কিন্তু এটি ব্রিটিশ সরকারকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। এর তাৎক্ষণিক ফলস্বরূপ ১৮৫৮ সালে ভারত শাসন আইন পাস হয়, যার মাধ্যমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনের অবসান ঘটে এবং ভারত সরাসরি ব্রিটিশ রাজের (Crown) অধীনে চলে আসে। এই ঘটনা ভারতে প্রশাসনিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনে।
→ ভারতীয় পুলিশ আইন প্রবর্তন (১৮৬১): ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ সরকার অনুভব করে যে সামরিক শক্তি ছাড়াও স্থানীয় প্রশাসনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। এই আইন প্রবর্তনের মাধ্যমে ভারতে আধুনিক, সুসংগঠিত পুলিশ ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত হয়। এই বাহিনী প্রাথমিকভাবে ঔপনিবেশিক ক্ষমতাকে শক্তিশালী করা এবং বিদ্রোহ দমনের লক্ষ্যেই তৈরি করা হয়েছিল।
→ দিল্লীর দরবার ও রাজকীয় ঘোষণা (১৮৭৭): ভাইসরয় লর্ড লিটনের সময়ে এই বিশাল দরবারের আয়োজন করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা যে, ব্রিটিশ রানী ভিক্টোরিয়া এখন থেকে ‘ভারত সম্রাজ্ঞী’ উপাধি গ্রহণ করেছেন। এই ঘটনা ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ রাজকীয় শক্তির পূর্ণ সার্বভৌমত্বের প্রকাশ ঘটায় এবং সাম্রাজ্যবাদের প্রতি ব্রিটিশ সরকারের অঙ্গীকারকে তুলে ধরে।
→ ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠা (১৮৮৫): ব্রিটিশ সিভিল সার্ভেন্ট অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউমের উদ্যোগে বোম্বাইয়ে এই রাজনৈতিক দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার প্রথম দিকে এর লক্ষ্য ছিল ব্রিটিশ সরকারের কাছে সংস্কারের দাবি পেশ করা। তবে সময়ের সাথে সাথে এটি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের মূল প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে এবং দেশের রাজনৈতিক চেতনাকে সংগঠিত করে তোলে।
বিংশ শতকের আন্দোলন
→ বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫): ভাইসরয় লর্ড কার্জন বাংলাকে দুই ভাগে (পূর্ববঙ্গ ও আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গ) বিভক্ত করেন। ব্রিটিশ সরকার প্রশাসনিক সুবিধার কথা বললেও, এর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ‘Divide and Rule’ (ভাগ করো ও শাসন করো) নীতির মাধ্যমে ক্রমবর্ধমান বাঙালি জাতীয়তাবাদকে দুর্বল করা। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে সমগ্র ভারতে স্বদেশী ও বয়কট আন্দোলন শুরু হয়, যা স্বাধীনতা সংগ্রামে গণ-অংশগ্রহণকে ব্যাপক করে তোলে।
→ বঙ্গভঙ্গ রদ ও ভারতের রাজধানী স্থানান্তর (১৯১১): বঙ্গভঙ্গকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট তীব্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে ব্রিটিশ সরকার তাদের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। একইসঙ্গে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের কেন্দ্র কলকাতা থেকে ক্ষমতা সরিয়ে নিতে এবং প্রশাসনিক গুরুত্ব বাড়াতে দিল্লিকে ভারতের নতুন রাজধানী ঘোষণা করা হয়। এই সিদ্ধান্ত বাংলার রাজনৈতিক গুরুত্ব কিছুটা কমিয়ে দেয়।
→ জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ড (১৯১৯): পাঞ্জাবের অমৃতসরে রাওলাট অ্যাক্টের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সময় নিরস্ত্র জনগণের ওপর জেনারেল ডায়ারের নির্দেশে ব্রিটিশ সৈন্যরা নির্বিচারে গুলি চালায়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি ছিল ঔপনিবেশিক বর্বরতার চরম নিদর্শন। এই ঘটনা মহাত্মা গান্ধীকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে এবং ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণ-আন্দোলনের জন্ম দেয়।
→ মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০-২২): জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ড এবং খিলাফত ইস্যুর প্রতিবাদে গান্ধীজি এই আন্দোলনের ডাক দেন। এটি ছিল ব্রিটিশ শাসনকে অকার্যকর করার জন্য প্রথম ব্যাপক গণভিত্তিক ও অহিংস আন্দোলন (Non-Cooperation Movement)। ছাত্র, কৃষক, শ্রমিকসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সরকারি স্কুল, আদালত ও বিদেশী পণ্য বর্জনের মাধ্যমে আন্দোলনে অংশ নেয়।
→ লবণ সত্যাগ্রহ ও আইন অমান্য আন্দোলন (১৯৩০-৩১): ব্রিটিশদের চাপানো অন্যায় লবণ করের প্রতিবাদে গান্ধীজি তাঁর বিখ্যাত ডান্ডি অভিযান শুরু করেন। এই আন্দোলন ছিল আইন অমান্য আন্দোলনের মূল ভিত্তি, যার মাধ্যমে ভারতীয়রা প্রকাশ্যে ব্রিটিশ আইন অমান্য করে। এটি স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
→ ভারত ছাড় আন্দোলন (১৯৪২): দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কঠিন পরিস্থিতিতে ব্রিটিশদের উপর চাপ সৃষ্টি করতে কংগ্রেস এই আন্দোলনের ডাক দেয়। গান্ধীজির ‘করেঙ্গে ইয়া মরেঙ্গে’ স্লোগানটি জনগণের মধ্যে উদ্দীপনা সৃষ্টি করে। এই বিদ্রোহ ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সর্বশেষ এবং সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যাপক গণবিদ্রোহ, যা ব্রিটিশদের বুঝতে বাধ্য করে যে ভারতে তাদের শাসন টিকিয়ে রাখা আর সম্ভব নয়।
→ ভারত ভাগ ও স্বাধীনতা (১৯৪৭): দীর্ঘ সংগ্রাম এবং রাজনৈতিক আলোচনার পর ব্রিটিশ সরকার মাউন্টব্যাটেন পরিকল্পনা এবং ভারত স্বাধীনতা আইন, ১৯৪৭ এর ভিত্তিতে ভারত শাসন ক্ষমতা হস্তান্তর করে। ফলস্বরূপ ধর্মীয় ভিত্তিতে ভারতীয় উপমহাদেশ ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়। যদিও এই ঘটনা স্বাধীনতা এনে দেয়, তবে দেশভাগজনিত সহিংসতা ও ব্যাপক অভিবাসন উপমহাদেশে এক গভীর মানবিক সংকটের সৃষ্টি করে।
উপসংহার
পরিশেষে বলা যায়, ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যকার ঘটনাসমূহ ছিল একইসাথে শোষণ, প্রতিরোধ এবং জাগরণের ইতিহাস। পলাশীর যুদ্ধ যেখানে ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত্তি স্থাপন করে, সেখানে সিপাহী বিদ্রোহ, বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন এবং মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে পরিচালিত অহিংস গণ-আন্দোলনগুলো ছিল স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষার অনির্বাণ শিখা। ব্রিটিশ নীতি ‘ভাগ করো ও শাসন কর’-এর মাধ্যমে যেমন হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে বিভেদের বীজ বপন করেছিল, তেমনি তা একটি সম্মিলিত জাতীয়তাবাদী চেতনাকেও জন্ম দিয়েছিল।
আরও পড়ুন
- লাহোর প্রস্তাব ১৯৪০: ধারা ও গুরুত্ব→
- যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৪: গঠনের পটভূমি ও নির্বাচনের ফলাফল→
- ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান: মুক্তিযুদ্ধে এর গুরুত্ব→
- মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা→
- মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান→
