● বিসিএস লিখিত: বাংলাদেশ বিষয়াবলি

গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রসারে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা | বিসিএস লিখিত

📌 এক নজরে

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম, আর সেই নির্বাচনের ভিত্তি নির্বাচন কমিশন। এই টপিক ৩৩তম ও ৩৭তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় এসেছে। এই পোস্টে জানবেন গণতন্ত্রের বিকাশে কমিশনের ভূমিকা কী এবং উত্তরটি কীভাবে যুক্তি দিয়ে সাজাবেন।

নির্বাচন কী?

নির্বাচন হলো জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের প্রক্রিয়া বা পদ্ধতি। স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত সকল স্তরে প্রার্থী বা প্রতিনিধি বাছাই করার জন্য যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় তাকে নির্বাচন বলে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় নির্বাচনের গুরুত্ব অপরিসীম। নির্বাচনের মাধ্যমে এক দিকে যেমন জনমত প্রকাশ পায় অন্যদিকে দেশের সকল স্তরে জনসাধারণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। এ কারণে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গড়ার ক্ষেত্রে নির্বাচনের ভূমিকা অপরিসীম।

Party politics এর Associate Editor paul David বলেন, “Election, the formal process of selecting a person for public office or of accepting or rejecting a political proposition by voting”. নির্বাচন জনগণ ও সরকারের মাঝে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করে এ ব্যবস্থায় জনসাধারণের অভাব অভিযোগ জানা এবং সেগুলো দূরীকরণে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ যথাযথ ভূমিকা পালনের সুযোগ পায়। নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১১ নং অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হবে। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচনের তাৎপর্য আলাদা।

নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা

অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা: গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণের পূর্ব শর্ত হচ্ছে কার্যকর নির্বাচন ব্যবস্থা। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা হচ্ছে গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ আর এই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় নির্বাচন কমিশন গঠিত এটি সাংবিধানিকভাবে গঠিত একটি প্রতিষ্ঠান। সংবিধানের ১১৮ এ নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব বর্ণিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সংবিধানে বর্ণিত নির্দেশাবলি এবং দেশের নির্বাচন আইন দ্বারা পরিচালিত হয়। বাংলাদেশে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশন বাংলাদেশ এর বিকল্প নেই। নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সীমানা নির্ধারণ, ভোটার তালিকা প্রণয়ন ও হালনাগাদ, জনসচেতনতা তৈরিসহ বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম করে থাকে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করার জন্য নির্বাচন কমিশনের নিম্নরূপ ভূমিকা পালন করতে পারে।

১। নির্বাচনী এলাকার সীমানা নির্ধারণ: বাংলাদেশ সংবিধানের ১১৯নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণ নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০টি নির্বাচনী এলাকা রয়েছে। সেখান থেকে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সংসদ সদস্যগণ নির্বাচিত হন। ভৌগোলিক আয়তন ও ভোটার সংখ্যার ভিত্তিতে নির্বাচনী এলাকা নির্ধারিত হয়। সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনঃনির্ধারণ আইন, ১৯৭৬ অনুযায়ী সর্বশেষ আদমশুমারির পর এবং প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে সীমানা পুনঃনির্ধারণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সীমানা পুনঃনির্ধারণের অন্যতম লক্ষ্য হলো নির্বাচনী এলাকাসমূহের মধ্যে ভোটার সংখ্যায় যতটুকু সম্ভব সমতা আনা, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত।

ভোটার তালিকা

২। ভোটার তালিকা প্রণয়ন: ভোটার হলো নির্বাচনের প্রাণ, ভোটার তালিকাতে সঠিকভাবে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিকের অন্তর্ভুক্তি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। প্রাপ্তবয়স্ক ভোটারদের ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তকরণের মাধ্যমে ভোটারদের সংখ্যা নির্ধারণ এবং সে অনুযায়ী কেন্দ্রগুলোতে সরঞ্জামাদি সরবরাহ নির্বাচন কমিশনের অন্যতম কাজ ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে এক ব্যক্তি যাতে একাধিক এলাকার ভোটার না হতে পারে তা নিশ্চিত করা হয়। ২০০৭ সালেও এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন এযাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে সঠিক তালিকা প্রণয়ন করেছিল। ফলে ২০০৮ সালে একটি শান্তিপূর্ণ ও সর্বোচ্চ ভোটার উপস্থিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৯ ও ২০১৪,২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচন ছবিসহ ভোটার তালিকার দ্বারা অনুষ্ঠিত হয়।

৩। ভোটার তালিকা নির্ভুল ও হালনাগাদকরণ: সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে একটি নির্ভুল ভোটার তালিকার বিকল্প নেই, ভোটার তালিকা নির্ভুল ও হালনাগাদ করার এ গুরুদায়িত্ব নির্বাচন কমিশন পালন করে থাকে। ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার বিষয়টি একটি নিরন্তর প্রক্রিয়া ভোটার তালিকা অধিকতর নির্ভুল ও ত্রুটিমুক্ত করাই এর উদ্দেশ্য প্রতিবছর অনেকে নতুন ভোটার হওয়ার উপযুক্ত হন তাদের নিবন্ধন, যেসব ভোটারদের মৃত্যু হয় তাদের নাম তালিকা থেকে বাদ যায়, কিছু সংখ্যক দ্বৈত ও ভুয়া ভোটার তালিকা থেকে বাদ যায়, বাংলাদেশের নাগরিক না হয়ে ভোটার তালিকাভুক্ত হওয়ার ঘটনাও থাকে। এগুলো সংশোধন করার জন্যই ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হয়।

মনোনয়ন ও তফসিল

৪। প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাছাইকরণ: সকল স্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বিতরণ, গ্রহণ এবং তা বাছাইকরণের দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। নির্বাচনের জন্য আগ্রহী প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র যাচাই বাছাই করেন রিটার্নিং অফিসার অর্থাৎ জেলা প্রশাসক ও দুজন বিভাগীয় কমিশনার। তাঁরা দেখেন প্রার্থী সকল তথ্য সঠিক দিয়েছেন কিনা, হলফনামা যথাযথভাবে পূরণ করেছেন কিনা, প্রার্থীর নামে ফৌজদারি মামলা আছে কিনা। সব তথ্য বিশ্লেষণ করে নির্বাচন কমিশন প্রার্থীর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। প্রার্থীর নামে ফৌজদারি মামলা থাকলে, তথ্য গোপন করলে, আসামী হলে তার প্রার্থীতা বাতিল হতে পারে। রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক বাতিল হওয়ার পর প্রার্থী নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রাথমিক পর্যায়ে আপিল করতে পারেন।

৫। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা: সাংবিধানিক দায়িত্ব হিসেবে বাংলাদেশের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন। সহজ ভাষায় বলা যায় নির্বাচনী তফসিল হলো নির্বাচন অনুষ্ঠানের আইনি ঘোষণা নির্বাচন আয়োজন করার জন্য যেসব কাজকর্ম জড়িত আছে তার জন্য সময় বেঁধে দেয়া হয়। নির্বাচনী তফসিলে নির্বাচনী এলাকা, নির্বাচনের নিয়মকানুন ভোট দানের নিয়ম, ভোটারের যোগ্যতা, নির্বাচনী প্রচারের নিয়ম কানুন, নির্বাচনের তারিখ প্রভৃতি বিষয় সম্পর্কে অন্তর্ভুক্ত থাকে।

প্রস্তুতি ও সমন্বয়

৬। দক্ষ কর্মী তৈরি: নির্বাচন কমিশনের পরিসর অনেক বৃহৎ, নির্বাচন সংক্রান্ত কাজ, নির্বাচনী আচরণবিধি, আইন-কানুন হালনাগাদ বিষয়ে কাজ করার জন্য অনেক দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হয়। এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার জন্য নির্বাচন কমিশন তাদের অধীনে কর্মকর্তাদের নির্বাচন সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কর্মী তৈরি করে। যাতে তারা বিভিন্ন নির্বাচনী কেন্দ্রে রিটার্নিং ও পোলিং অফিসারসহ নানা দায়িত্ব পালন করে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করেন, ১৯৯৫ সালে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ইটিআই) বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের একটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট হিসেবে যাত্রা শুরু করে। এ প্রতিষ্ঠানটি নিবিড় প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নির্বাচনী কর্মকাণ্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল কর্মকর্তা কর্মচারীকে পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি সাহায্য করে আসছে।

৭। নির্বাচনী আইনের বাস্তবায়ন: নির্বাচন কমিশন শুধু নির্বাচনের আইন-কানুন তৈরিই নয় বাস্তবায়নেও বিশেষ ভূমিকা রাখে। নির্বাচনে কোনো প্রার্থী যদি আইন ভঙ্গ করে যেমন- প্রচারণায় মাইকের ব্যবহার টাকার বিনিময়ে ভোট ক্রয় বা অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে তবে তাঁকে নির্বাচন কমিশনের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশন তার প্রার্থীতা বাতিল করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে।

৮। স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয়: সাংবিধানিকভাবে শাসন বিভাগ নির্বাচন কমিশনকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করবে বলে লিপিবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু নির্বাচনের সময় অনেক ক্ষেত্রেই নানা কারণে স্থানীয় প্রশাসন অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে এবং স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তা কর্মচারীগণ কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ফলে নির্বাচনের সময় একটি সমন্বয়হীনতার অভাব দেখা দেয়। এক্ষেত্রে স্থানীয় নির্বাচন কার্যালয়কে ক্ষমতা অর্পণ করা হলে সমন্বয় সুষ্ঠু হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

৯। ভোট গ্রহণ ও ফলাফল প্রকাশ: নির্বাচনের যাবতীয় সকল কর্মকাণ্ড নির্বাচন কমিশনের দ্বারা হয়ে থাকে। নির্বাচনের কেন্দ্রে ব্যালট পেপার ও ব্যালট বাক্স সরবরাহ থেকে শুরু করে ভোটদান প্রক্রিয়া সকল কাজ নির্বাচন কমিশন রিটার্নিং অফিসার আইন শৃঙ্খলা বাহিনীদের সহায়তার করে থাকে। ব্যালট পেপার গণনার মাধ্যমে সর্বোচ্চ ভোটপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বিজয়ী ঘোষণা করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। ভোটদান প্রক্রিয়া আরও গতিশীল করার জন্য নির্বাচন কমিশন বর্তমানে ভোট সংগ্রহে ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) পদ্ধতি ব্যবহার শুরু করেছে।

১০। যোগ্যতা যাচাইকরণ: নির্বাচন পরবর্তী কোন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে তাঁর পদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ বা বিতর্ক দেখা দিলে নির্বাচন কমিশন সে বিষয়ে তদারকি করে থাকে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে। সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাহায্য লাগবে?
BCS Journey Support
● Online
×
💬Messenger ✈Telegram
BCS JOURNEY
BCS Journey
চ্যাট শুরু করুন ➜