● বিসিএস লিখিত: বাংলাদেশ বিষয়াবলি

এলডিসি থেকে উত্তরণ: বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জগুলো কী কী | বিসিএস লিখিত

📌 এক নজরে

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ বাংলাদেশের মর্যাদা বাড়াবে, কিন্তু সঙ্গে আসবে নতুন চ্যালেঞ্জ। এই পোস্টে উত্তরণের প্রেক্ষাপট, সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ এবং এগুলো মোকাবিলার প্রস্তুতি লিখিত পরীক্ষার ভঙ্গিতে সাজানো হয়েছে।

“

“২০২৬ সালেই বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণ করা হবে। এ জন্য যে চ্যালেঞ্জগুলো আসবে, তা মোকাবিলা করার জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। এটি বাংলাদেশের মর্যাদাও আরও বৃদ্ধি পাবে।” – ড. মুহাম্মদ ইউনুস।

বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের নির্ধারিত সময়সীমা পিছিয়ে দেওয়ার চিন্তা থেকে সরে এসেছে সরকার। অর্থাৎ নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ২০২৬ সালেই এলডিসি থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

প্রেক্ষাপট: ১৯৭৫ সালে এলডিসি তালিকায় যুক্ত হয় বাংলাদেশ। এলডিসিভুক্ত দেশ হওয়ার কারণে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য-সুবিধাসহ নানা সুবিধা পেয়েছে বাংলাদেশ। বর্তমানে বিশ্বে ৪৪টি স্বল্পোন্নত দেশ রয়েছে। এলডিসি দেশগুলোও একধরনের উন্নয়নশীল দেশ। যেসব

দেশের সক্ষমতা তুলনামূলক কম, তাদের এই তালিকায় রাখা হয়। আগামী পাঁচ বছরে এলডিসি তালিকা থেকে বের হতে অপেক্ষায় আছে ছয়টি দেশ। বাংলাদেশ ছাড়াও ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের তালিকায় আরও দুটি দেশ লাওস ও নেপাল আছে।

এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য মানদণ্ড: এলডিসি থেকে কোন দেশ বের হবে, সে বিষয়ে সুপারিশ করে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)। এ জন্য প্রতি তিন বছর পরপর এলডিসিগুলোর ত্রৈবার্ষিক মূল্যায়ন করা হয়। মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচক দিয়ে একটি দেশ উন্নয়নশীল দেশ হতে পারবে কি না, সেই যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়।

যেকোনো দুটি সূচকে যোগ্যতা অর্জন করতে হয় কিংবা মাথাপিছু আয় নির্দিষ্ট সীমার দ্বিগুণ করতে হয়। এই মানদণ্ড সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হয়। ১৯৭১ সালে প্রথম স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা করা হয়। এ পর্যন্ত গত পাঁচ দশকে সব মিলিয়ে মাত্র আটটি দেশ এলডিসি থেকে বের হয়েছে। দেশগুলো হলো ভুটান, বতসোয়ানা, কেপ ভার্দে, ইকুয়েটোরিয়াল গিনি, মালদ্বীপ, সামোয়া, ভানুয়াতু, সাও টোমো অ্যান্ড প্রিন্সেপ।

Graduation Criteria:

GROSS NATIONAL INCOME (GNI) PER CAPITA

≥$1,230

INCOME-ONLY: ≥$2,460

A country that meets 2/3 graduation criteria during 2 consecutive triennial reviews of the UN CDP is recommended for graduation.

HUMAN ASSETS INDEX (HAI)

≥66

ECONOMIC VULNERABILITY INDEX (EVI)

≤32

Alternatively, a country may be considered for graduation if its income per capita is 2x the income threshold.

বাংলাদেশের অবস্থান: প্রতি তিন বছর পর এলডিসিগুলোর মূল্যায়ন করা হয়। কোনো দেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হতে পারবে কি না, সে যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয় মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ, জলবায়ু ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা—এই তিন সূচকের ভিত্তিতে। এ ক্ষেত্রে যেকোনো দুটি সূচকে যোগ্যতা অর্জন করতে হয় কিংবা মাথাপিছু আয় নির্দিষ্ট সীমার দ্বিগুণ করতে হয়। সিডিপির সর্বশেষ ২০২৪ সালের মূল্যায়নে দেখা যায় যে বাংলাদেশ সব সূচকেই উত্তীর্ণ হয়েছে। যেমন বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ৬৮৪ ডলার। মাথাপিছু আয় সূচকে মাথাপিছু আয় কমপক্ষে ১ হাজার ৩০৬ ডলার হতে হয়। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ পয়েন্টের ওপরে থাকতে হয়, যা বাংলাদেশের আছে সাড়ে ৭৭ পয়েন্ট। এ

এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে বাংলাদেশ

এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে বাংলাদেশ

  • ১৯৭৫এলডিসি হিসেবেঅন্তর্ভুক্ত হয়।
  • ২০২১এলডিসি থেকে উত্তরণেজাতিসংঘ-সিডিপিরচূড়ান্ত সুপারিশ।
  • ২০১৮ ও ২০২১তিনটিসূচকেই পাসবাংলাদেশ।
  • ২০২৪তিনসূচকেইউত্তীর্ণ।
  • উত্তরণ প্রক্রিয়া

২০২৪ সালের মূল্যায়ন

  • মাথাপিছু আয় সূচক

বাংলাদেশের মান ২৬৮৪ ডলার

সর্বনিম্ন সীমা ১,৩০৬ ডলার

  • মানবসম্পদ সূচক

বাংলাদেশের মান ৭৭.৫

সর্বনিম্ন সীমা ৬৬

  • অর্থনৈতিক ও পরিবেশের ভঙ্গুরতা সূচক

বাংলাদেশের মান ২১.৯

সর্বনিম্ন সীমা ৩২-এর কম

এলডিসি থেকে উত্তরণের তারিখ ২৪ নভেম্বর ২০২৬

চ্যালেঞ্জ

  • বৈশ্বিক সংকট।
  • ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা।
  • জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি।
  • বিদেশি সহযোগিতা বাড়ানো।

ছাড়া অর্থনৈতিক ও পরিবেশের ভঙ্গুরতা সূচকে একটি দেশের ৩২ পয়েন্টের নিচে থাকতে হয়। এটি বাংলাদেশের ২১ দশমিক ৯ পয়েন্ট। এর আগে ২০১৮ ও ২০২১ সালেও সব কটি সূচকে বাংলাদেশ উত্তীর্ণ হয়েছিল। পরপর দুটি ত্রিবার্ষিক মূল্যায়নে নির্দিষ্ট মান অর্জন করলেই এলডিসি থেকে বের হওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত সুপারিশ করে সিডিপি। সিডিপির সুপারিশগুলো চলতি ২০২৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য ওঠার কথা ছিল। কিন্তু করোনার কারণে বাংলাদেশ বাড়তি আরও দুই বছর সময় পেয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে বের হবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ যদি এলডিসি থেকে উত্তীর্ণ হয়, তাহলে বাংলাদেশই হবে প্রথম দেশ, যারা তিনটি সূচকেই উত্তীর্ণ হয়ে বের হবে।

বাংলাদেশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জসমূহ: বাংলাদেশ ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (LDC) তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে, এই উত্তরণ নতুন কিছু চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করবে। সিডিপি মনে করে, বাংলাদেশসহ যে ছয়টি দেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে রয়েছে, তাদের সবার সামনেই চারটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চ্যালেঞ্জগুলো হলো বৈশ্বিক সংকট; ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা; জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি; বিদেশি সহযোগিতা বাড়ানো।

“২০২৬ সালেই এলডিসি উত্তরণ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত। এখন উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতিতে মনোযোগ দিতে হবে। এ জন্য একটি উত্তরণকালীন কৌশল ঠিক করা আছে। প্রশাসনিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও আর্থিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে প্রস্তুতি নিতে হবে। জোর দিতে হবে অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণ, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষায়।”

– সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

এক নজরে চ্যালেঞ্জসমূহ

বিদেশি সহযোগিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা হারানো অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য
স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা বিনিয়োগ আকর্ষণের চ্যালেঞ্জ শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা হারানো
সুশাসন ও দুর্নীতি দমন তথ্যপ্রযুক্তি ও শিল্পখাতের দুর্বলতা রপ্তানি খাতে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি
ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ঝুঁকি জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব
শ্রম বাজার ও দক্ষতা উন্নয়ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন মুদ্রানীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে এবং প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা বৃদ্ধি ছাড়া এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যাবে না। বাংলাদেশ এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) থেকে উত্তরণ করতে চাইলেই যে চ্যালেঞ্জগুলো সামনে আসবে, তা কেবল অর্থনৈতিক দিকেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বাণিজ্য, প্রশাসনিক কাঠামো, সামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষেত্রেও ব্যাপক। নিচে বাংলাদেশের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরা হলো—

  1. ১রপ্তানি আয়ের ক্ষতি ও বাজার সুবিধা হারানো: এলডিসি অবস্থায় থাকাকালীন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক বাজারে অনেক শুল্ক সুবিধা ও কোটামুক্ত বাজারের সুবিধা পেয়ে থাকে। তবে গ্র্যাজুয়েশন (উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর) এলে এই সুবিধাগুলো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। আন্তর্জাতিক বাজারে এখন উচ্চ শুল্কে পণ্য রপ্তানি করতে হবে। বেশ কিছু প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে — এলডিসি থেকে উত্তরণের পর রপ্তানি আয়ে প্রায় ১৪.২৮% হ্রাসের আশঙ্কা রয়েছে এবং কিছু গবেষণা অনুযায়ী, এটি বছরে আনুমানিক ৮ বিলিয়ন ডলার আয়ের ক্ষতির কারণ হতে পারে। এর ফলে দেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে গার্মেন্টস, ফার্মাসিউটিক্যালস ও অন্যান্য শিল্পক্ষেত্রে ব্যাপক প্রতিযোগিতার চাপ সৃষ্টি হবে।
  2. ২অর্থনৈতিক ঋণ ও আর্থিক সহায়তার অভাব: এলডিসি অবস্থায় থাকা অবস্থায় আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ও ঋণদাতা দেশগুলো থেকে সহজ শর্তে ঋণ ও আর্থিক সহায়তা পাওয়া যেত। কিন্তু গ্র্যাজুয়েশন এর পর, এই ধরনের বিশেষ সুবিধা

কমে যাবে এবং বাংলাদেশকে বাজার ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও উচ্চ সুদের হারে ঋণ গ্রহণ করতে হবে। এর ফলে ঋণের পরিশোধ ও ব্যালান্স শীটের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে। গত কয়েক দশকে ঋণের অপচয় ও দুর্নীতির সমস্যা থেকেও সাবধান থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে চীনের ঋণের ক্ষেত্রে যে অস্পষ্টতা বিদ্যমান, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

  1. ১শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা হারানো: বর্তমানে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU), যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ভারত, চীনসহ বিভিন্ন দেশে এলডিসি (Least Developed Country) সুবিধা ভোগ করছে। এর ফলে বাংলাদেশি পণ্য এসব দেশে শুল্কমুক্ত বা অগ্রাধিকারমূলক শুল্কহারে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর এসব সুবিধা হারাবে। ফলে রপ্তানির ওপর নতুন শুল্ক আরোপিত হবে, যা বাংলাদেশের পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা কমিয়ে দেবে। বিশেষ করে, পোশাক শিল্পে শুল্কবৃদ্ধির কারণে রপ্তানি হ্রাস পেতে পারে।
  2. ২শুল্ক ও বাণিজ্য নীতিমালার পুনর্গঠন: উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরের পরে, বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থার (WTO) বিধিবিধান ও উচ্চ শুল্ক নীতির আওতায় কাজ করতে হবে। এর ফলে এলডিসি অবস্থায় উপভোগ্য ছিল এমন শুল্কমুক্ত বা কোটামুক্ত সুবিধা হারিয়ে যাবে। রপ্তানি ক্ষেত্রে শুল্কের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে পণ্যের মূল্যস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশের পণ্যের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হতে পারে। এই পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্পের প্রতিযোগিতামূলকতা বজায় রাখতে নতুন নীতিমালা, সহায়তা কাঠামো এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে হবে।
  3. ৩রপ্তানি খাতে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি: বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত হলো তৈরি পোশাক শিল্প, যা বিশ্ববাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধার জন্য প্রতিযোগিতায় এগিয়ে ছিল। কিন্তু এলডিসি সুবিধা হারালে বাংলাদেশের পোশাক খাতকে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, কম্বোডিয়ার মতো দেশের সঙ্গে সমান শুল্ক দিয়ে প্রতিযোগিতা করতে হবে। অনেক দেশ ইতোমধ্যে উন্নত প্রযুক্তি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করেছে, যা বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।
  4. ৪স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা: বিদেশি বিনিয়োগ ও আমদানি বাড়লে দেশীয় শিল্প প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য বিশেষ সহায়তা দরকার হবে। স্থানীয় শিল্পকে উদ্ভাবন ও দক্ষতার মাধ্যমে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হবে। এজন্য সরকারকে বিশেষ নীতি সহায়তা দিতে হবে।
  5. ৫অভ্যন্তরীণ নীতিমালা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি: গ্র্যাজুয়েশন প্রক্রিয়ার সাথে সাথে দেশের নীতিমালা ও প্রশাসনিক কাঠামোকে পুনর্গঠন করতে হবে। দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা, শিল্পনীতি, আমদানি-রপ্তানি নীতি ও কর ব্যবস্থা পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় থাকে। এছাড়া, নীতি-নির্ধারক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক খাতে স্বচ্ছতা ও সুশাসনের বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে, যা পূর্বে এলডিসি সুবিধার কারণে কিছু ক্ষেত্রে উপেক্ষিত ছিল। এই পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার সময় অভ্যন্তরীণ সমন্বয় ও কার্যকরী বাস্তবায়নের অভাব দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুরক্ষায় প্রভাব ফেলতে পারে।
  6. ৬জলবায়ু ও পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশ একটি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত। এলডিসি সুবিধার আওতায় থাকা অবস্থায় কিছু আন্তর্জাতিক সহায়তা পেতেও এই বিষয়ে কিছু সমাধান হত। তবে গ্র্যাজুয়েশন হলে, উন্নয়ন সহায়তার পরিমাণ কমে যাওয়ায় দেশের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা সীমিত হতে পারে। পাশাপাশি, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে পরিবেশগত মানদণ্ড মেনে চলার চাপও বেড়ে যাবে, যা অতিরিক্ত ব্যয়বহুল হতে পারে।
  7. ৭বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব: বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ বা মহামারির মতো বৈশ্বিক সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে জ্বালানি

সংকট, মূল্যস্ফীতি, এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বাধার সৃষ্টি হয়েছে, যা বাংলাদেশের রপ্তানি ও বিনিয়োগ প্রবাহকে প্রভাবিত করেছে। এ ধরনের সংকট ভবিষ্যতেও প্রবৃদ্ধি ব্যাহত করতে পারে।

  1. ১ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ঝুঁকি: আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা, ভারত-চীনের উত্তেজনা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধসহ নানা ভূরাজনৈতিক বিষয় বাংলাদেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে। আবার ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতি পরিবর্তন হলে বাংলাদেশের বাণিজ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
  2. ২মানবসম্পদ উন্নয়ন ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ: উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানবসম্পদ উন্নয়ন। গ্র্যাজুয়েশন প্রক্রিয়ায় দেশকে মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানদণ্ড পূরণ করতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ও মানবসম্পদ সূচক উন্নতির পথে থাকলেও, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আরও উন্নতির প্রয়োজন। এর মাধ্যমে দেশের দক্ষ শ্রমবাজার তৈরি করা যাবে যা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সহায়ক হবে।
  3. ৩বিদেশি সহযোগিতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা: এলডিসি থেকে উত্তরণের ফলে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অনুদান, সহজ শর্তে ঋণ ও অন্যান্য সুবিধা কমে যেতে পারে। বাংলাদেশ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর জন্য বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি, এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হলে এসব সহযোগিতা কঠোর শর্তযুক্ত হবে।
  4. ৪বৈদেশিক বিনিয়োগ ও ব্র্যান্ডিং: গ্র্যাজুয়েশন প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি নতুন বার্তা দেয়। যদিও এটি দেশের জন্য ইতিবাচক দিক হতে পারে, তবে দেশের অবকাঠামো, ব্যবসায়িক পরিবেশ ও আইন-শৃঙ্খলা আরও উন্নত করতে হবে যাতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায়। নতুন বিনিয়োগের আগ্রহের সাথে সাথে আন্তর্জাতিক মানের ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরির প্রয়োজন, যা বর্তমান অবস্থা থেকে অনেকটাই পরিবর্তনের দরকার বাংলাদেশের জন্য। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হলে বাংলাদেশকে কর কাঠামো সহজ করা, ব্যবসা-বান্ধব নীতি গ্রহণ করা এবং অবকাঠামো উন্নত করতে হবে। বর্তমানে ব্যবসা-বান্ধব পরিবেশ না থাকায় বিনিয়োগকারীরা ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশকে বেশি পছন্দ করে।
  5. ৫প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও উদ্ভাবন: আজকের বিশ্ব ডিজিটাল ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের উপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশকে একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে সাফল্যের সাথে উত্তরণ করতে হলে দেশের প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও ডিজিটাল অর্থনীতি শক্তিশালী করতে হবে। তথ্যপ্রযুক্তি, ই-কমার্স ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তি গ্রহণ করলে দেশের উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার জন্য অপরিহার্য। তবে এই ক্ষেত্রেও বিনিয়োগ, প্রশিক্ষণ ও নীতিগত সমন্বয়ের প্রয়োজন যা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশ এলডিসি থেকে উত্তরণের পথে একাধিক ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে – রপ্তানি আয়ের ক্ষতি, আর্থিক সহায়তা হ্রাস, শুল্ক ও বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন, অভ্যন্তরীণ নীতিমালা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি, জলবায়ু ও পরিবেশগত চাপ, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বিদেশী বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ। তবে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার জন্য ইতোমধ্যে বিভিন্ন গবেষণা, নীতি ও প্রস্তুতির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। উপযুক্ত নীতি, দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশ এই পরিবর্তনের সাফল্যের সাথে মোকাবিলা করতে পারবে বলে আশা করা যায়।

“অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে সুষ্ঠুভাবে উত্তরণ নিশ্চিত করার জন্য যথাসম্ভব সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে” – বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাহায্য লাগবে?
BCS Journey Support
● Online
×
💬Messenger ✈Telegram
BCS JOURNEY
BCS Journey
চ্যাট শুরু করুন ➜