● বিসিএস লিখিত: বাংলাদেশ বিষয়াবলি

আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা কী? সুবিধা ও ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্টের সাথে পার্থক্য | বিসিএস লিখিত

📌 এক নজরে

বাংলাদেশে প্রচলিত নির্বাচন পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া প্রার্থী জয়ী হন, যাকে বলা হয় ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’। এর বিকল্প হিসেবে আনুপাতিক ব্যবস্থা প্রায়ই আলোচনায় আসে। এই পোস্টে আনুপাতিক ব্যবস্থা কী, এর সুবিধা কী এবং প্রচলিত পদ্ধতির সাথে পার্থক্য পাবেন।

বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রধানত দুটি ব্যবস্থা বিদ্যমান। প্রথমত, একটি নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থীদের মধ্যে যিনি সর্বোচ্চ ভোট পাবেন তিনি নির্বাচিত হবেন। এ পদ্ধতিকে বলা হয় ‘ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট’। এ পদ্ধতি বাংলাদেশে চালু রয়েছে। অন্যটি সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা বা প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন (পিআর) পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে একটি দল যে পরিমাণ ভোট পাবে, সেই অনুপাতে সংসদে দলটির প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ হবে। অনেক দেশে এ দুটি পদ্ধতির সমন্বিত ব্যবস্থাও চালু রয়েছে।

সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন ব্যবস্থা পৃথিবীর শতাধিক দেশের চালু আছে। উন্নত দেশগুলোর সংস্থা অর্গানাইজেশন অব ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশনভুক্ত (ওইসিডি) ৩৬টি দেশের মধ্যে ২৫টি, অর্থাৎ প্রায় ৭০ শতাংশ দেশই আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা অনুসরণ করে। এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা ও নেপালে সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা চালু আছে। অবশ্য সব দেশ একই পদ্ধতি অনুসরণ করে না। সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা তিন ধরনের। এর মধ্যে একটি হচ্ছে দলভিত্তিক, আরেকটি হচ্ছে ব্যক্তিভিত্তিক। আর অন্যটি হচ্ছে মিশ্র পদ্ধতি। দলভিত্তিক ব্যবস্থায় কোনো দলীয় প্রার্থী নির্বাচন করেন না। নির্বাচন করে দল। সেখানে ভোটাররা দলীয় প্রতীকে ভোট দিয়ে থাকেন। ভোটের হার অনুযায়ী দলগুলো সংসদে তাদের প্রতিনিধি নির্ধারণ করে। আবার ব্যক্তিভিত্তিক নির্বাচনে দলগুলো আগেই তাদের মনোনীত প্রতিনিধিদের নাম প্রকাশ করে। তারপর আঞ্চলিক ও জাতীয়ভিত্তিক ভোটের হার অনুযায়ী দলগুলো তাদের প্রতিনিধি নিশ্চিত করে। নেদারল্যান্ডসে দলভিত্তিক ও স্পেনে ব্যক্তিভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থা রয়েছে। এ দুই পদ্ধতি বিশ্বের বেশিরভাগ দেশেই রয়েছে। তবে পদ্ধতিগত ভিন্নতা আছে। আবার অনেক দেশে ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট এবং সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব দুই ব্যবস্থার সংমিশ্রণও আছে। যেমন এশিয়ার নেপাল। দেশটিতে নিম্নকক্ষের মোট আসন ২৭৫টি। এর মধ্যে ১৬৫

বাংলাদেশের বর্তমান পদ্ধতি

আসনে বাংলাদেশের মতো যে প্রার্থী বেশি ভোট পাবেন, তিনিই বিজয়ী হন। আর ১১০ আসনে আনুপাতিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। উচ্চকক্ষের মোট ৫৯টি আসনের পাঁচটি সংরক্ষণ করে বাকি ৫৪টিতেও আনুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন করা হয়।

বাংলাদেশে সংসদীয় আসনভিত্তিক নির্বাচন ব্যবস্থা চালু আছে। এ পদ্ধতিতে যে প্রার্থী বেশি ভোট পাবেন, তিনি নির্বাচিত হবেন। আবার তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকলে তিনি বিনাভোটে বিজয়ী হবেন। সংসদে মোট ৩৫০ আসনের মধ্যে ৩০০টিতে সরাসরি ভোটে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। বাকি ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসন, যারা দলগুলোর আসন অনুপাতে নির্বাচিত হন।

আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব কী?

আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর হচ্ছে নির্বাচনি ব্যবস্থার এমন একটি পদ্ধতি যেখানে আসন বণ্টন হয় প্রতিটি রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যদি কোন দল মোট প্রদত্ত ভোটের শতকরা ১০ শতাংশ পায়, তাহলে সেই দল আনুপাতিক হারে সংসদের ১০ শতাংশ বা ৩০টি আসন পাবেন।

পিয়ার বা আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে মুক্ত, গোপন ও মিশ্র তিনটি আনুপাতিক নির্বাচন ব্যবস্থা রয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

নির্বাচন ব্যবস্থার প্রেক্ষাপটে, একটি বিধানসভায় প্রতিটি প্রতিনিধি প্রায় সমান সংখ্যক ভোটার দ্বারা নির্বাচিত হয়। নির্বাচনী ব্যবস্থার সাধারণ ক্ষেত্রে যা শুধুমাত্র একটি দলকে বেছে নেওয়ার অনুমতি দেয়, প্রতিটি দল প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা বা ভোট ভাগের অনুপাতে আসন বণ্টন করা হয়।

আনুপাতিক পদ্ধতির সুবিধা

সুবিধা: এ পদ্ধতিতে একটি নির্বাচনে দেওয়া প্রত্যেকটি ভোট কাজে লাগে এবং প্রতিটি ভোট সংসদে সমানভাবে প্রতিনিধিত্ব করে। তাছাড়া একটি নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা ও হারের ভিত্তিতে সংসদে আসন বণ্টন হয়। অনেক সময় খুব সামান্য পার্থক্য থাকলেও অনেক দল সংসদে একটি আসনও পায় না। কিন্তু এই পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে তাতে ন্যূনতম ভোট পেলে সব রাজনৈতিক দলেরই প্রতিনিধিত্ব থাকার সুযোগ রয়েছে সংসদে।

“কোনো দল নির্বাচনে যত শতাংশ ভোট পাবে, সংসদে তারা সেই অনুপাতে আসন পাবে, নির্বাচনের এই আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি যদি চালু হয় তাহলে তা সুশাসন নিশ্চিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।” – নির্বাচন বিশ্লেষক অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ

“সব ভোটারদের মতামতের প্রতিফলন ঘটানো সম্ভব এই পদ্ধতিতে ভোটের মাধ্যমে।” – রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ

বাংলাদেশে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা যে দলই পেয়েছে তারা নিজেদের স্বার্থে সংবিধান পরিবর্তন করেছে। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে কোনো দলেরই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সম্ভব হবে না বললেই চলে। ফলে জোট সরকার গঠন করতে হবে। এতে করে এককভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথও বন্ধ হয়ে যাবে। তারা মনে করেন, প্রধানমন্ত্রীকে স্বৈরাচারী হওয়ার পথ বন্ধ করার একমাত্র উপায় হলো সংসদে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা।

সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচনে ভোটারদের ভোটের মূল্যায়ন হয়। কালো টাকা ও পেশিশক্তির প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার সুযোগ তৈরি হয়। কারণ এ পদ্ধতিতে ভোটের আয়োজন হলে অঞ্চলভিত্তিক সংসদ সদস্য মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে প্রতিযোগিতা, টাকার খেলা ও সন্ত্রাসের গুরুত্ব থাকবে না। আগেই দল থেকে তালিকা প্রকাশ করবে। দলগুলো যত শতাংশ ভোট পাবে সে অনুযায়ী আসন পাবে।

প্রচলিত পদ্ধতির সাথে পার্থক্য

প্রচলিত নির্বাচন ব্যবস্থার সাথে পার্থক্য: বর্তমান বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচন ব্যবস্থায় ৩০০টি আসনে আলাদা আলাদা প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে রাজনৈতিক দলগুলো।

ধরা যাক, বর্তমান পদ্ধতিতে জাতীয় নির্বাচনে একটি আসনে মোট চারজন প্রার্থী চারটি দল থেকে নির্বাচন করছে। এই নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৮৫ শতাংশ। এর মধ্যে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তিনজন প্রার্থীই ২০ শতাংশ করে ভোট পেল। আর চতুর্থ প্রার্থী পেলো ২৫ শতাংশ ভোট। বর্তমান পদ্ধতি অনুযায়ী চতুর্থ প্রার্থীই এই আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন। আর ওই তিনটি দলের ৬০ শতাংশ ভোট তেমন কোন কাজে আসছে না।

একই ভাবে সারাদেশের অন্তত ২৯০ আসনে যদি একই হারে ভোট পেয়ে চতুর্থ দলটির প্রার্থীরা জয়লাভ করে, তাহলে মাত্র ২৫ শতাংশ ভোট নিয়ে তারা সরকার গঠনসহ সংসদে একচ্ছত্রভাবে আধিপত্য করবে।

অথচ বাকি তিন দল মিলে ৬০ শতাংশ ভোট পেলেও তাদের কোন প্রতিনিধিত্ব থাকলো না সংসদে। এতে সংসদে প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ থাকে না।

বিশ্লেষকের মত

“এই পদ্ধতিতে ভোট হলে নিজস্ব ভোট ব্যাংকে কাজে লাগিয়ে বা স্থানীয় ইমেজ কাজে লাগিয়ে কেউ জিতে সরকার গঠন করতে পারে। সেক্ষেত্রে অনেক সময় মেজরিটি ভোটারের মতের প্রতিফলন হয় না” – নির্বাচন বিশ্লেষক অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ

আনুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতিতে ভোটের আগে প্রতিটি দল ক্রম ভিত্তিতে প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করবে। প্রতিটি রাজনৈতিক দল তার প্রাপ্ত ভোটের হার অনুসারে আসন সংখ্যা পাবে।

“কিছু রাজনৈতিক দল সারাদেশে গড়ে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ভোট পেলেও সংসদে তাদের কোন প্রতিনিধিত্ব থাকে না আসনভিত্তিক একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না হওয়ার কারণে। এই পদ্ধতিতে ভোট হলে সে সব দলের সংসদে প্রতিনিধিত্ব থাকবে”

– রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাহায্য লাগবে?
BCS Journey Support
● Online
×
💬Messenger ✈Telegram
BCS JOURNEY
BCS Journey
চ্যাট শুরু করুন ➜