রাষ্ট্র, নাগরিকতা ও আইন অধ্যায়ের নোট | SSC বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়ের ৬ষ্ঠ অধ্যায় “রাষ্ট্র, নাগরিকতা ও আইন” জ্ঞানমূলক ও অনুধাবনমূলক প্রশ্ন উত্তর নিচে দেওয়া হলো। এই পোস্টে ৫১টি জ্ঞানমূলক ও ৬টি অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর আছে। বহুনির্বাচনি প্রশ্নের জন্য রাষ্ট্র, নাগরিকতা ও আইন অধ্যায়ের MCQ দেখুন।
রাষ্ট্র, নাগরিকতা ও আইন অধ্যায়ের জ্ঞানমূলক প্রশ্ন ও উত্তর
আইনের ধারণা, বৈশিষ্ট্য, উৎস ও সুশাসনে প্রয়োজনীয়তা
1। আইন প্রধানত কয় ধরনের?
দুই ধরনের— সামাজিক আইন ও রাষ্ট্রীয় আইন।
2। টি. এইচ. গ্রীনের মতে আইন কী?
রাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত অধিকার এবং বাধ্যবাধকতাসমূহ আইন।
3। উড্রো উইলসনের আইনের সংজ্ঞা কী?
আইন হলো সমাজের সেইসকল প্রতিষ্ঠিত প্রথা ও রীতিনীতি যেগুলো সমাজ ও রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃত এবং সরকারের ক্ষমতা দ্বারা বলবৎ করা হয়।
4। আইনের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
আইন সর্বজনীন, তা রাষ্ট্রের সকলের উপর সমানভাবে প্রযোজ্য।
5। হল্যান্ডের মতে আইনের কয়টি প্রধান উৎস আছে ও কী কী?
৬টি— প্রথা, ধর্ম, বিচার সংক্রান্ত রায়, বিজ্ঞানসম্মত আলোচনা, ন্যায়বোধ ও আইনসভা।
6। প্রথা আইনের উৎস কীভাবে?
সমাজে প্রচলিত রীতিনীতি ও অভ্যাস কালক্রমে রাষ্ট্র কর্তৃক স্বীকৃতি পেয়ে আইনে পরিণত হয়; ব্রিটেনের অধিকাংশ আইন প্রথা থেকে এসেছে।
7। ইসলামি আইন প্রধানত কীসের ওপর নির্ভরশীল?
কুরআন ও শরিয়ার ওপর।
8। বিচারকের রায় আইনের উৎস কীভাবে হয়?
প্রচলিত আইনে সঠিক সমাধান না পেলে বিচারক নতুন ব্যাখ্যা দিয়ে রায় দেন, যা দৃষ্টান্ত হয়ে পরবর্তীতে আইনে পরিণত হয়।
9। আধুনিক রাষ্ট্রে আইনের প্রধান উৎস কী?
আইনসভা।
10। আইনের অনুশাসন কয়টি ধারণা প্রকাশ করে?
দুটি— আইনের প্রাধান্য ও আইনের দৃষ্টিতে সকলের সাম্য।
11। আইনের প্রাধান্য বজায় থাকলে কী হয়?
সরকার স্বেচ্ছাচারী হতে পারে না এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করতে সাহস করে না।
12। আইনের শাসনের পরিপন্থী কাজ কী কী?
বিনা অপরাধে গ্রেফতার, বিনা বিচারে আটক রাখা।
13। আইনের দৃষ্টিতে সাম্য বলতে কী বোঝায়?
ধনী-দরিদ্র, সবল-দুর্বল, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলেই সমান, কেউ বাড়তি সুবিধা পাবে না।
14। আইনের শাসন কায়েম হতে কী প্রয়োজন?
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি।
15। আইনের প্রাধান্যকে কী বলা হয়?
নাগরিক স্বাধীনতার রক্ষাকবচ।
রাষ্ট্রের অপরিহার্য ও কল্যাণমূলক কার্যাবলি
16। রাষ্ট্রের কার্যাবলি প্রধানত কয় ভাগে বিভক্ত?
দুই ভাগে— অপরিহার্য বা মুখ্য কার্যাবলি এবং কল্যাণমূলক বা ঐচ্ছিক কার্যাবলি।
17। ম্যাকাইভারের মতে রাষ্ট্রের প্রাথমিক কাজ কী?
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করা।
18। বাংলাদেশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী কী?
পুলিশ, আনসার, গ্রাম প্রতিরক্ষা দল।
19। প্রতিরক্ষা বাহিনী কী নিয়ে গঠিত?
স্থল, নৌ ও বিমান বাহিনীর সমন্বয়ে।
20। রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র বিষয়ক অপরিহার্য কাজ কী কী?
কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন, চুক্তি সম্পাদন, আঞ্চলিক জোট গঠন এবং বিদেশে নাগরিকদের নিরাপত্তা প্রদান।
21। বিচার ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রের কোন কাজ সম্পন্ন হয়?
আইন প্রণয়ন, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা।
22। রাষ্ট্রীয় আয়ের মুখ্য উৎস কী?
খাজনা ও কর।
23। অর্থ সংক্রান্ত রাষ্ট্রের মুখ্য কার্যাবলি কী কী?
বাজেট প্রণয়ন, মুদ্রা প্রবর্তন, মূল্য নির্ধারণ ও মুদ্রাস্ফীতি রোধ।
24। কল্যাণমূলক বা ঐচ্ছিক কার্যাবলি কাকে বলে?
জনকল্যাণ ও উন্নয়নে রাষ্ট্রের যে কাজগুলো করে, যা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও কর আদায়ের বাইরে সমাজের সামগ্রিক উন্নতির জন্য করা হয়।
25। রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কল্যাণমূলক কাজ কী?
জনসাধারণকে শিক্ষিত করে তোলা।
26। জনস্বাস্থ্য রক্ষায় রাষ্ট্র কী কী প্রতিষ্ঠা করে?
হাসপাতাল, দাতব্য চিকিৎসালয়, শিশুসদন, মাতৃমঙ্গল কেন্দ্র ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র।
27। সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে রাষ্ট্র কী কী ভূমিকা রাখে?
যৌতুক ও বর্ণপ্রথা দূরীকরণ, বাল্যবিবাহ রোধ এবং জেন্ডার সমতা প্রতিষ্ঠা।
28। রাষ্ট্রের বিবিধ উন্নয়নমূলক কাজের উদাহরণ দাও।
কৃষি ও সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, বনায়ন কর্মসূচি, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা ও গ্রামীণ উন্নয়ন।
29। অর্থনৈতিকভাবে উন্নত রাষ্ট্রের ঐচ্ছিক কার্যাবলি কেমন হয়?
অর্থনৈতিকভাবে যত বেশি উন্নত রাষ্ট্র, তার ঐচ্ছিক কার্যাবলি তত বেশি বিস্তৃত হয়।
রাষ্ট্রের ধারণা ও উপাদান
30। অ্যারিস্টটলের মতে রাষ্ট্র কী?
স্বয়ংসম্পূর্ণ জীবনের জন্য কতিপয় পরিবার ও গ্রামের সমন্বয়ে গঠিত সংগঠনই রাষ্ট্র।
31। আর. এম. ম্যাকাইভারের মতে রাষ্ট্র কী?
সরকার কর্তৃক প্রণীত আইন দ্বারা পরিচালিত একটি সংগঠন, যার কর্তৃত্বমূলক ক্ষমতা রয়েছে এবং যা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে বসবাসরত অধিবাসীদের ওপর বলবৎ হয়।
32। অধ্যাপক গার্নারের রাষ্ট্রের সংজ্ঞা কী?
রাষ্ট্র হলো বহুসংখ্যক ব্যক্তি নিয়ে গঠিত এমন এক জনসমাজ, যারা নির্দিষ্ট ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে বসবাস করে, বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ হতে মুক্ত এবং যাদের একটি সুসংগঠিত সরকার আছে।
33। রাষ্ট্রের চারটি উপাদান কী কী?
জনসমষ্টি, নির্দিষ্ট ভূখণ্ড, সরকার ও সার্বভৌমত্ব।
34। রাষ্ট্র গঠনে জনসংখ্যার কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম আছে কি?
না, রাষ্ট্র গঠনের জন্য জনসংখ্যার কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই; গণচীন-ভারতের জনসংখ্যা একশ কোটির উপরে, আবার স্যানম্যারিনো-মোনাকোর জনসংখ্যা মাত্র কয়েক হাজার।
35। ভূখণ্ড বলতে কী বোঝায়?
স্থলভাগ, সমুদ্রসীমা ও আকাশসীমা।
36। সরকারের তিনটি বিভাগ কী কী?
আইনবিভাগ, শাসনবিভাগ ও বিচারবিভাগ।
37। গার্নারের মতে সরকার কী?
রাষ্ট্র যদি হয় জীবদেহ তবে সরকার হলো এর মস্তিষ্কস্বরূপ।
38। সার্বভৌমত্ব কী?
রাষ্ট্রের চরম ও চূড়ান্ত ক্ষমতাকে সার্বভৌমত্ব বলে, যার ফলে নিজের ইচ্ছা ছাড়া অন্য কোনো ইচ্ছার দ্বারা রাষ্ট্র আইনসঙ্গতভাবে আবদ্ধ নয়।
39। সার্বভৌম ক্ষমতার দুটি দিক কী কী?
অভ্যন্তরীণ (রাষ্ট্রের মধ্যকার ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠানের ওপর কর্তৃত্ব) এবং বাহ্যিক (আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বহিঃশক্তির নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত থাকা)।
40। বাংলাদেশ কবে সার্বভৌম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়?
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে।
নাগরিকের ধারণা ও দায়িত্ব-কর্তব্য
41। Citizen শব্দের উৎপত্তি কোথা থেকে?
ল্যাটিন শব্দ Civics থেকে।
42। অ্যারিস্টটলের মতে নাগরিক কে?
সে ব্যক্তিই নাগরিক যে নগর রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব ও শাসনকার্যে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।
43। হ্যারল্ড জে. লাস্কির মতে নাগরিক কে?
যে ব্যক্তি রাষ্ট্রের সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে এবং রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকার করে তাকেই নাগরিক বলা হয়।
44। অধ্যাপক গেটেলের মতে নাগরিক কে?
নাগরিক হচ্ছে রাজনৈতিক সমাজের সেসব সদস্য, যারা কর্তব্য পালনে বাধ্য থাকেন এবং সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধা লাভের অধিকারী হন।
45। গ্রিক নগররাষ্ট্রে কাদের নাগরিক হিসেবে গণ্য করা হতো না?
দাস এবং নারীদের।
46। নাগরিকের প্রধান কর্তব্য কী?
রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা।
47। নাগরিকের ভোটদান সংক্রান্ত দায়িত্ব কী?
সততা ও সুবিবেচনার সাথে ভোট দেওয়া, অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজ প্রার্থীকে ভোটদানে বিরত থাকা।
48। রাষ্ট্রীয় আয়ের প্রধান উৎস কী ও এতে নাগরিকের দায়িত্ব কী?
কর ও খাজনা; নাগরিকদের যথাসময়ে কর প্রদান করা কর্তব্য।
49। পিতামাতার নাগরিক দায়িত্ব কী?
সন্তানদের প্রতিষেধক টিকাদান, সুস্থ রাখা এবং নির্দিষ্ট সময়ে স্কুলে পাঠানো।
50। দুর্নীতির বিরুদ্ধে নাগরিকদের করণীয় কী?
প্রতিবাদ জানানো, তবে কোনোক্রমেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যাবে না।
51। নাগরিকের সামাজিক দায়িত্ব কী?
সমাজের অন্যান্য সদস্যের অধিকার ও মর্যাদাকে সম্মান জানানো এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা করা।
রাষ্ট্র, নাগরিকতা ও আইন অধ্যায়ের অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর
আইনের ধারণা, বৈশিষ্ট্য, উৎস ও সুশাসনে প্রয়োজনীয়তা
1। বিচারকের রায় কীভাবে আইনের একটি উৎস হয়ে ওঠে— ব্যাখ্যা করো।
কোনো মামলায় প্রচলিত আইনে সমাধান না পাওয়া গেলে বিচারক নিজের বুদ্ধি-মেধা-প্রজ্ঞা দিয়ে প্রচলিত আইনের সাথে সঙ্গতি রেখে নতুন ব্যাখ্যা প্রদান করেন, এই রায় পরবর্তীতে দৃষ্টান্ত হিসেবে অন্যান্য মামলায় অনুসৃত হতে হতে একসময় প্রতিষ্ঠিত আইনে পরিণত হয়ে যায়।
2। আইনের প্রাধান্য ছাড়া নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষা সম্ভব নয়— ব্যাখ্যা করো।
আইনের প্রাধান্য না থাকলে সরকার স্বেচ্ছাচারী হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারে এবং বিনা অপরাধে গ্রেফতার বা বিনা বিচারে আটকের মতো ঘটনা ঘটতে পারে, তাই আইনের প্রাধান্য বজায় থাকলেই নাগরিকের ব্যক্তিস্বাধীনতা প্রকৃতপক্ষে সুরক্ষিত থাকে, এই কারণে একে নাগরিক স্বাধীনতার রক্ষাকবচ বলা হয়।
রাষ্ট্রের অপরিহার্য ও কল্যাণমূলক কার্যাবলি
3। প্রতিরক্ষা বাহিনীর আধুনিকায়ন রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুবিধা দেয় কীভাবে— ব্যাখ্যা করো।
শক্তিশালী ও আধুনিক প্রতিরক্ষা বাহিনী থাকা রাষ্ট্রগুলো আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অধিক প্রভাব বিস্তার করতে পারে এবং বিশ্ব রাজনীতিতে নেতৃত্বদানের সুযোগ পায়, যেমন আমেরিকা-যুক্তরাজ্য-রাশিয়ার বিশ্বব্যাপী নেতৃত্বের পেছনে তাদের শক্তিশালী প্রতিরক্ষা বাহিনীর ভূমিকা রয়েছে।
4। রাষ্ট্র শিক্ষা বিস্তারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় কেন— ব্যাখ্যা করো।
শিক্ষিত জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ, কারণ শিক্ষিত নাগরিক নিজের অধিকার-দায়িত্ব-কর্তব্য সম্বন্ধে সচেতন থাকেন এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হন, তাই রাষ্ট্র বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষাসহ শিক্ষা বিস্তারে অধিক গুরুত্ব প্রদান করে।
রাষ্ট্রের ধারণা ও উপাদান
5। সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব নষ্ট হয় না কেন— ব্যাখ্যা করো।
সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের একটি স্থায়ী বৈশিষ্ট্য, যা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের সাথে সম্পৃক্ত, সরকার শুধু রাষ্ট্রের ক্ষমতা পরিচালনার একটি মাধ্যম মাত্র; তাই সরকার পরিবর্তিত হলেও যতদিন রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব বিদ্যমান থাকে ততদিন সার্বভৌমত্বের স্থায়িত্বও বজায় থাকে।
নাগরিকের ধারণা ও দায়িত্ব-কর্তব্য
6। অধিকার ও কর্তব্য পরস্পর নির্ভরশীল ও পরিপূরক— ব্যাখ্যা করো।
রাষ্ট্র নাগরিকদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার প্রদান করে, বিনিময়ে নাগরিকদেরও রাষ্ট্রের প্রতি কতগুলো দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হয়; একটি ছাড়া অন্যটি অর্থহীন, তাই অধিকার ভোগ ও কর্তব্য পালন একে অপরের ওপর নির্ভরশীল ও পরিপূরক।
