● বিসিএস লিখিত: বাংলাদেশ বিষয়াবলি

সংসদে নারীর সংরক্ষিত আসন: প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা | বিসিএস লিখিত

📌 এক নজরে

সংসদে নারীর জন্য আসন সংরক্ষণ কতটা যৌক্তিক, এই প্রশ্ন ২৪তম ও ৩৮তম বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় এসেছে। মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা থেকে শুরু করে প্রতিনিধিত্বের প্রয়োজনীয়তা পর্যন্ত যুক্তিগুলো এখানে সাজানো আছে, যাতে আপনি গুছিয়ে উত্তর লিখতে পারেন।

১৯৭১ সালে ন’মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি বিজয় লাভ করে। স্বাধীনতা যুদ্ধে পুরুষদের পাশাপাশি নারীরা যে সাহসী ভূমিকা রেখেছিল তা জাতি আজও স্মরণ করে। তারা মুক্তিযুদ্ধে অত্যাধুনিক অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলাযুদ্ধ থেকে শুরু করে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। শুধু মুক্তিযুদ্ধে নয় ভাষা আন্দোলনেও রয়েছে নারীর অসামান্য অবদান। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। ১৯৭২ সালে প্রণীত বাংলাদেশের প্রথম স্থায়ী সংবিধানে ১০ বছরের জন্য ১৫টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল। ১৯৭৮ সালে সংরক্ষিত মহিলা আসন বাড়িয়ে ৩০টি করা হয়। ২০০৪ সালে সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীতে আসন বাড়িয়ে ৪৫টি করা হয় এবং সর্বশেষ ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে মহিলাদের জন্য জাতীয় সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনীতে জাতীয় সংসদে মহিলাদের জন্য ৫০টি আসন ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষিত রাখার বিধান করা হয়েছে।

বাংলাদেশ সংবিধানের ১৯ অনুচ্ছেদে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতার বিধান রয়েছে এবং ২৮ (২) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে।

জাতীয় সংসদে নারীর সংরক্ষিত আসনের প্রয়োজনীয়তা:

রবী ঠাকুর বলেছেন, “অন্যের কোলে কাঁধে চড়ে অগ্রসর হওয়াকে অগ্রসর হওয়া বলা চলে না। নিজের শক্তিতে যে যতদূর যেতে পারে সেটাই তার কৃতিত্ব।” যুগ যুগ ধরে নারীরা পুরুষের উপর নির্ভর করে পথ চলে এসেছে। ফলে নারী-পুরুষের মাঝে এক ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। নারীদেরকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে। বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেক নারী। এই বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক আবহ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা মোটেই সমীচীন নয় এবং তা দেশের জন্য কল্যাণকরও নয়। হুমায়ূন আজাদের নিম্নের উক্তিতেই এদেশের নারী সমাজের দৈন্যতার চিত্র ফুটে উঠে-

“গত দু-শো বছরে গবাদি পশুর অবস্থার যতটা উন্নতি ঘটেছে নারীর অবস্থার ততোটা উন্নতি ঘটেনি।”

নারীদের এরকম দৈন্য দশা থেকে বের করে আনতে প্রয়োজন রাজনৈতিক সচেতনতা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের স্বাধীনতা। এর জন্য প্রয়োজন পুরুষতান্ত্রিক বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে মানবিক সমতাভিত্তিক বৈষম্যহীন একটি সমাজ ও রাষ্ট্র গঠন। নারীর ক্ষমতায়ন তখনই সম্ভব যখন কোনো বাধা বা সীমাবদ্ধতা ছাড়াই নারীরা শিক্ষা কর্মজীবন, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং নিজেদের জীবনধারায় পরিবর্তন আনার জন্য সমাজে বিদ্যমান সুযোগ সুবিধাগুলো ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। নারী যাতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তার নেতৃত্বকে বিকশিত করতে পারে সেজন্য রাজনীতিতে অধিক হারে নারীর অংশগ্রহণের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য জাতীয় সংসদে নারীর সংরক্ষিত আসন রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন।

সংবিধানে সংরক্ষিত আসন

সংবিধানের ৬৫ (৩) অনুচ্ছেদে নারীর জন্য জাতীয় সংসদে আসন সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে। ১৯৭২ সালের দিকে নারীরা তুলনামূলকভাবে ঘর থেকে কম বের হতো এবং নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে তেমন সামাজিক প্রেক্ষাপট ছিল না। নারীর ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নারী যাতে সমাজের কাছে একজন দায়বদ্ধ প্রতিনিধির ভূমিকা রাখতে পারে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় তার অংশীদারি নিশ্চিত করতে পারে তাও নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডে নারীর অধিকতর অংশগ্রহণের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে। গণতন্ত্রের চর্চা সফল করতে হলে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলের প্রতিটি স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশ নারীকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় বা রাজনৈতিক পরিবার থেকেই সাধারণত সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ নির্বাচন করা হয়। এই চর্চা থেকে বেরিয়ে এসে যোগ্যতা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের উপর ভিত্তি করে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ নির্বাচন করতে হবে। নারীর সংরক্ষিত আসন সংখ্যা নির্ধারিত হয় রাজনৈতিক দলের আকারের উপর। সংসদ নির্বাচনে যে দল যত আসন পায় সেই সংখ্যার আনুপাতিক হারে সংরক্ষিত আসন বণ্টনের ব্যবস্থা করা হয়।

সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত নারী প্রতিনিধিরা যে দলেরই হোন না কেন নারী ইস্যুতে তারা যদি দলের বিপক্ষে ভোট দিতে পারেন তবেই নারী সমাজের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব হবে। এজন্য সংরক্ষিত নারী আসনের কোনো বিকল্প নেই।

সাংবিধানিকভাবে জাতীয় সংসদের সাধারণ আসন ও সংরক্ষিত আসনের সদস্যদের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ সদস্যদের কারও কারও সংকীর্ণ মনোভাবের কারণে সংরক্ষিত আসনের নারী সদস্যরা বৈষম্যের শিকার হয় এবং এলাকার উন্নয়নে তারা তেমন ভূমিকা রাখতে পারে না। এ বিষয়গুলো দূর করতে না পারলে নারীর ক্ষমতায়ন সম্ভব হবে না।

রাজনৈতিক দলের অঙ্গীকার

রাজনৈতিক দলগুলোর নারীর ক্ষমতায়নের ব্যাপারে যে অঙ্গীকার রয়েছে তা যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হলে তৃণমূল থেকে কেন্দ্রে অর্থাৎ সব পর্যায়ে এক-তৃতীয়াংশ নারীর নেতৃত্বদানের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। দেশের অর্ধেক জনগণকে সক্রিয় রাজনীতির মূলস্রোতে না এনে নির্বাচন করলে তা গণতান্ত্রিক হবে না। তাই জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, মন্ত্রী থেকে শুরু করে রাজনীতি, প্রশাসন ও বিভিন্ন পর্যায়ে নারীর অবস্থান নারীর অগ্রযাত্রার ইঙ্গিতবহ।

আরও পড়ুন

মন্তব্য করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

সাহায্য লাগবে?
BCS Journey Support
● Online
×
💬Messenger ✈Telegram
BCS JOURNEY
BCS Journey
চ্যাট শুরু করুন ➜