“মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান ছিল অবিস্মরণীয়। দুই লাখ নারীর আত্মত্যাগে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা।”
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নারীরা এগিয়ে এসেছিল মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, গেরিলা নেত্রী ও সহযোদ্ধা। নারীরা মুক্তি যোদ্ধাদের সাহায্যার্থে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন। পাকিস্তানি স্বৈরাচারদের নির্যাতন, অত্যাচার, ধর্ষণের মুখেও মুক্তিযুদ্ধে নারীরা বিভিন্নভাবে সাহসিকতা ও বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান ছিল তাৎপর্যপূর্ণ এবং এ অবদানকে ছোট করে দেখার উপায় নেই।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান
“আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অনেক অবদান আছে। তারা যেমন ট্রেনিংয়ে গেছে, তেমনি যুদ্ধক্ষেত্রেও সহযোগিতা করেছে। তারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে নানা নির্যাতনের শিকার হন।”
মুক্তিযুদ্ধে যারা অসামান্য অবদান রেখেছেন, তাদের মধ্যে প্রশিক্ষণ সেবার দায়িত্বে নিয়োজিত কানন দেবী, উপাসনা রায়, সুধারানী কর, পূর্ণিমা রানী দাস ও নিপা রানী মজুমদারের নাম উল্লেখযোগ্য। প্রাথমিক চিকিৎসায় প্রীতি রানী দাস পুরকায়স্থ, শুক্লা রানী দে, হেমলতা দেব ছাড়াও আরো অনেকে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। নিম্নে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীদের অবদান তুলে ধরা হলো:
নারীদের বিভিন্ন ভূমিকা
- অস্ত্র হাতে নারী: যুদ্ধক্ষেত্রে নারীরা পুরুষের পাশাপাশি সশস্ত্র অংশগ্রহণ করেছিল।
- সংগ্রামে নারী: মুক্তিযুদ্ধে সংগ্রামের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সমাবেশ, মিছিল মিটিং ও সেমিনারের আয়োজন করেছিল। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহিত করার জন্য বিভিন্ন ধরনের গান ও নাটক রচনা করেছিল।
- আত্মোৎসর্গ: দুই লক্ষ নারী তাদের সম্ভ্রম হারিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে।
- গুপ্তচর: যেকোনো যুদ্ধের সময় তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা পালন করে। এই গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ নারীরা দক্ষতার সাথে পালন করেছে। এক্ষেত্রে পুরুষের পাশাপাশি গ্রামগঞ্জের নারীরাও পাকবাহিনী ও রাজাকারদের দৃষ্টি এড়িয়ে খবরাখবর সংগ্রহের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ধরনের তথ্য দিয়ে যুদ্ধের পরিকল্পনা করতে সাহায্য করেছিল।
- জনমত গঠন: মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের বাইরে অনেক স্বাধীনতাকামী নারীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিল। মিসেস বদরুন্নেছা আহমেদ, বেগম রাফিয়া আক্তার, মতিয়া চৌধুরী, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদিকা মালেকা বেগম মালেকা বেগম, আয়েশা খানম প্রমুখ এই দায়িত্ব পালন করেছেন।
- গেরিলা যুদ্ধ: বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীরা গেরিলা বাহিনীতে যোগ দিয়ে বিভিন্ন সেক্টরের অধীনে অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করে গেছে।
- মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা: যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য রান্না-বান্না, খাদ্য ও অস্ত্র সরবরাহকারিণী হিসেবে নারীদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। অনেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আহারের ব্যবস্থা করতেন।
- সেবা প্রদান: যুদ্ধের সময় অনেক মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে আহত হয়েছিলেন। সেসব মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করার জন্য নারীরা এগিয়ে এসেছিল।
- অনুপ্রেরণা দান: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য নারীরা অনুপ্রেরণা দিতো। দেশকে শত্রুমুক্ত করার লক্ষ্যে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে এদেশের অনেক মা তার ছেলেকে যুদ্ধে পাঠিয়েছেন।
- স্বাধীনবাংলা বেতার কেন্দ্রে নারীদের ভূমিকা: মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী জনগণের অন্যতম প্রেরণার উৎস ছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে সংবাদ পাঠিকা, লেখিকা, নাট্যকর্মী ইত্যাদি সংস্কৃতি অঙ্গনের অনেক নারীই অংশগ্রহণ করেছেন।
- অস্ত্রহাতে প্রশিক্ষণ: নারী সমাজের সদস্য প্রাণশক্তিকে মুক্তিযুদ্ধে যুক্ত করার জন্য তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ, ত্রাণমন্ত্রী কামরুজ্জামান হেনা ও জাতীয় পরিষদ সদস্য সাজেদা চৌধুরীর প্রচেষ্টায় মুক্তিযোদ্ধা নারীদের প্রশিক্ষণের জন্য প্রশিক্ষণ ক্যাম্প প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে নারী মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষণ নেন এবং সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
- তহবিল সংগ্রহ: অনেক নারী মুক্তিযোদ্ধাদের তহবিল সংগ্রহে ভূমিকা পালন করতেন।
- নির্যাতন সহ্য: মুক্তিযুদ্ধকালীন বাঙালি নারীদের ওপর ধর্ষণ ও নির্যাতন দেখে সর্বস্তরের জনগণ ঘৃণা ও প্রতিহিংসায় জ্বলে ওঠে। এই ঘৃণা থেকে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে জনগণ সংগঠিত হয়ে মুক্তিবাহিনী গঠন করে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
- স্বাধীনতার পক্ষে গান: বাংলাদেশে মুক্তি সংগ্রাম চলাকালে যোদ্ধাদের মনোবল অটুট রাখা এবং সক্ষম নর-নারীদের স্বাধীনতায়ুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য অনুপ্রাণিত করে তোলার ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। শাহনাজ বেগমের কণ্ঠে, ‘সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা, কল্যাণী ঘোষের পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে।’ এমন অজস্র গানের সুর শুনে মানুষ দুঃখকে শক্তি বানিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে দেশ রক্ষার সংগ্রামে।
- পাকবাহিনীকে ভুল তথ্য প্রদান: মুক্তিযোদ্ধাদের পরামর্শে অনেক নারীরা পাকবাহিনীদেরকে ভুল তথ্য দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের তৈরি করা ফাঁদে ফেলতে চেষ্টা করেছিল। যখন পাক বাহিনীরা ঐ নারীর কথা শুনে মুক্তিযোদ্ধাদের আগে থেকে ঠিক করে রাখা ফাঁদে পা দিত তখন মুক্তিযোদ্ধারা “হিট এন্ড রান” প্রক্রিয়ায় আক্রমণ করত।
- মুক্তিযুদ্ধের দুই নারী নক্ষত্র: ক্যাপ্টেন ডা. সিতারা সেক্টর-২ এর অধীনে সেখানের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন। তাকে নিয়মিত আগরতলা থেকে ঔষধ আনার কাজ করতে হতো। হাসপাতালে একটি অপারেশন থিয়েটার ছিল। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, বাঙালি ছাড়াও ভারতীয় সেনাবাহিনীর লোকজন চিকিৎসাসেবা নিত। যুদ্ধের সময় আঁচলে হ্যান্ড গ্রেনেড বেঁধে ঘুরতেন ক্যাপ্টেন ডা: সিতারা বেগম। এছাড়াও তারামন বিবি প্রথমে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবার রান্নার কাজে ক্যাম্পে আসলেও মুহিব হাবিলদার নামে এক মুক্তিযোদ্ধা তার সাহসিকতা দেখে সশস্ত্র যুদ্ধে নামিয়ে দেন। পরবর্তীতে সেতারা বেগম ও তারামন বিবি দুইজনই “বীর প্রতীক” উপাধি পেয়েছেন।
নারীরা শুধু অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেনি, তারা নিজেদের ইজ্জতের বিনিময়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন এবং এভাবেই তারা অতুলনীয় অবদান রেখেছেন।
“বিশ্বে যা কিছু সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
- কবি কাজী নজরুল ইসলাম
আরও পড়ুন
- ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭: ব্রিটিশ শাসনামলের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা→
- লাহোর প্রস্তাব ১৯৪০: ধারা ও গুরুত্ব→
- যুক্তফ্রন্ট ১৯৫৪: গঠনের পটভূমি ও নির্বাচনের ফলাফল→
- ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান: মুক্তিযুদ্ধে এর গুরুত্ব→
- মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর সরকারের ভূমিকা→
